বায়োগ্রাফি :বিলাল ফিলিপস

আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস

(ইংরেজি: Abu Ameenah Bilal Philips) (জন্ম: ডেনিস ব্রাডলি ফিলিপস, ৬ জানুয়ারি ১৯৪৬, জ্যামাইকা) হলেন একজন সমকালীন মুসলিম ইসলামী শিক্ষক, বক্তা এবং লেখক[১][২] যিনি বর্তমানে কাতারে বসবাসরত আছেন| তিনি পিস টিভিতে বক্তব্য রাখেন, যেটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে প্রচারিত একটি ২৪ ঘন্টার ইসলামিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল|

ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি
বিলাল ফিলিপস ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি নামে কাতারে একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানের অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন| অনলাইনে ইসলামভিত্তিক বিষয়সমূহ থেকে পড়াশুনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জনের সুব্যবস্থা রয়েছে এই ওয়েবসাইট বিশ্ববিদ্যালয়টিতে| এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিলাল ফিলিপস তার ওয়েবসাইটে বলেন, “দূরশিক্ষণ বর্তমানে একটি কার্যকরী ব্যবস্থা হয়ে উঠছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মুসলিমরা তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে শিক্ষালাভ করতে পারবে|” বর্তমানে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এর দাপ্তরিক শাখা বিদ্যমান এবং শাখা ভুক্ত দেশ সহ তার বাহিরেও বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে|

প্রকাশনা
বইসমূহ
Fundamentals of TAWHEED (Islamic Monotheism) International Islamic Publishing House; ISBN 9960-9648-0-9[৫]
The Evolution of Fiqh (Islamic Law & The Madh-habs) International Islamic Publishing House (Edited by Bradley Philips);  প্রকাশনা
বইসমূহ
Fundamentals of TAWHEED (Islamic Monotheism) International Islamic Publishing House; ISBN 9960-9648-0-9[৫]
The Evolution of Fiqh (Islamic Law & The Madh-habs) International Islamic Publishing House (Edited by Bradley Philips);
True Message of Jesus Christ Islamic Book Services 2006; ISBN 81-7231-360-8[৭]
Purpose of Creation 84pp, Islamic Book Services 2002; ISBN 81-7231-358-6[৮]
Funeral Rites International Islamic Publishing House; ASIN 9960850846[৯]
Polygamy in Islam Islamic Book Services; ISBN 81-7231-715-8[১০]
Islamic Studies Al-Basheer 2002; ISBN 1-898649-19-7[১১]

True Message of Jesus Christ Islamic Book Services 2006; ISBN 81-7231-360-8[৭]
Purpose of Creation 84pp, Islamic Book Services 2002; ISBN 81-7231-358-6[৮]
Funeral Rites International Islamic Publishing House; ASIN 9960850846[৯]
Polygamy in Islam Islamic Book Services; ISBN 81-7231-715-8[১০]
Islamic Studies Al-Basheer 2002; ISBN 1-898649-19-7[১১]

অন্তরের কাঠিন্য – ডঃ আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস পর্ব -১

হালাল ও হারাম সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত হাদীসে  মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তেরর গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন :

“আমাদের শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে যা সুস্থ থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে আর যা অসুস্থ হলে সারা শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেটি হচ্ছে হৃদয়।” [সম্পূর্ণ হাদীসটি হচ্ছে : আন-নু’মান বিন বাশীর কর্তৃক বর্ণিত : আমি আল্লাহ’র রাসূলকে বলতে শুনেছি, “হালাল ও হারাম উভয়েই স্পষ্ট, কিন্তু এ দুটির মাঝখানে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়সমূহ যা অধিকাংশ লোকই জানেনা। সুতরাং যে নিজেকে সন্দেহজনক বিষয় থেকে বাঁচিয়ে চলে, সে তার দ্বীন ও সম্মানের সংরক্ষণ করে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণ হচ্ছে সেই রাখালের মত যে তার মেষপাল চরায় কোন সংরক্ষিত চারণভূমির কাছাকাছি এমন ভাবে যে, যে কোন মুহূর্তে সে তাতে প্রবেশ করবে। (হে লোকসকল!) সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত সীমানা আছে এবং আল্লাহর সংরক্ষিত সীমানা হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ। সাবধান! আমাদের শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে যা সুস্থ (পরিশুদ্ধ) থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে, কিন্তু যদি তা কলুষিত হয়ে যায় সারা শরীর কলুষিত হয় এবং সেটি হচ্ছে হৃদয়।”] (বুখারী, প্রথম খণ্ড, ৪৯ নং হাদীস)

কথাটি তিনি বলেছেন, প্রথমে একথা ব্যাখ্যা করার পর যে হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট এবং এদের মাঝখানের ক্ষেত্রটি অস্পষ্ট যা অনেকেই জানেনা। যাহোক, যা একজন মানুষকে হারাম থেকে বাঁচতে ও হালাল অবলম্বন করতে সাহায্য করে তা হচ্ছে জ্ঞান ; এবং জ্ঞান ছাড়া আর যা একাজটি করতে পারে, তা হচ্ছে অন্তেরর অবস্থা। যদি অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, জ্ঞানকে ব্যবহার করে তা হারাম এড়িয়ে চলতে পারে। যদি তা কলুষিত হয়, জ্ঞান কোন উপকারে আসে না এবং মানুষ নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে।

বিদায় হজ্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবাদের ও অনাগত মুসলিম জাতিসমূহের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যে, কোন অনারবের উপর কোন আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই ; কালোর উপর সাদার কোন প্রাধান্য নেই, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই শ্রেষ্ঠ যে আল্লাহকে ভয় করে – যে তাকওয়া অর্জন করেছে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি বলেন, “তাকওয়ার অবস্থান হচ্ছে আমাদের অন্তের।” এটি এবং অনুরূপ আরো বক্তব্যে অন্তেরর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে – যাকে আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট অন্য সব অঙ্গের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

ঈমানের অবস্থান এখানেই। শরীরের অন্য কোন অঙ্গ যদি আল্লাহর আরো কাছের হতো, তাকওয়া সেখানেই অবস্থান করতো, কারণ মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ঈমান। এ ছাড়া আর কিছুরই মূল্য নেই। যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, যারা তাঁর বাণী গ্রহণ করেছে এবং যারা জান্নাতকে জাহান্নামের পরিবর্তে বেছে নিয়েছে – ঈমান তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ঈমান বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্য। দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে ঈমানের মূল্য বেশী। সেজন্য আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে কোন একজন মানুষকেও ইসলামের পথ দেখানো দুনিযার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। কারো জন্য অন্য কাউকে ঈমান অর্জনে সাহায্য করা যে কোন পার্থিব বস্তুর চেয়ে মূল্যবান।

কাজের শুদ্ধতার বিচার করা হয় হৃদয়ের অবস্থা দিয়ে। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্ললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে :

“কর্মের বিচার করা হয় নিয়ত অনুসারে।” নিয়ত বা ইচ্ছার স্থান ঠোঁটে নয়, হৃদয়ে। [হাদীসটির পূর্ণ বক্তব্য : উমর বিন খাত্তাব বর্ণনা করেছেন : আল্লাহর রাসূল বলেছেন, “কর্মফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেকই তা পাবে যা সে চেয়েছে। অতএব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যেই। আর যে কোন পার্থিব স্বার্থ অর্জন বা কোন মহিলাকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে, তার হিজরত সে জন্যই যে জন্য সে হিজরত করেছে।”] (বুখারী, প্রথম খণ্ড,  ৫১ নং হাদীস)

আমরা যে কাজই বাহ্যিকভাবে করি না কেন, আমাদের হৃদয়ের অবস্থা তখন কি ছিল, তা দিয়েই তার বিচার হবে। এগুলি হচ্ছে ভাল কাজ। মন্দ কাজ মন্দই, কিন্তু ভাল কাজ বলতে আমরা যা বুঝি তা সেসব কাজ যা ন্যায়পরায়ণতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ বিচার করবেন সত্যিই সেগুলি ন্যায় কাজ কিনা।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে প্রথম যে তিন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে ফেলা হবে তারা মানুষের দৃষ্টিতে বড় বড় কল্যাণকর কাজে লিপ্ত ছিল। তারা হচ্ছে জ্ঞানের প্রচারে নিয়োজিত আলেম, ধনী ব্যক্তি যে তার সম্পদ থেকে দান করতো এবং আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শাহাদাৎ বরণকারী। একটি সহীহ হাদীসে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে তারা প্রথম জাহান্নামে নিক্ষিপ্তদের অন্তর্ভূক্ত হবে। কারণ সেই আলেম আল্লাহর সন্তুটির জন্য জ্ঞান প্রচার করতো না, করতো মানুষের কাছে বড় একজন জ্ঞানী হিসাবে সম্মান ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য। আলাহ তাকে বলবেন : “দুনিয়াতে তুমি যা চেয়েছিলে সেই প্রশংসা তুমি পেয়ে গেছো, আখিরাতে তোমার জন্য কিছু নেই।” তারপর তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। একইভাবে ধনী লোকটিও তার ধন-সম্পদ উদার হস্তে দান করতো যাতে লোকে তাকে মহান দাতা হিসাবে প্রশংসা করে। কিন্তু আল্লাহ বলবেন, “তুমি প্রশংসার জন্য দান করেছ এবং তা পেয়েছো। তুমি বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর জন্য তা করনি। যতক্ষণ লোকে প্রশংসা করেছে, তুমি বদান্যতা দেখিয়েছো, কিন্তু লোকে যখন তোমার প্রতি মনোযোগ দেয়নি, তুমিও দান করা বন্ধ করে দিয়েছ। তোমার বদান্যতা ছিল শর্তযুক্ত, আলাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়।” অতঃপর তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। আর যে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছিল, আল্লাহ তাকে বলবেন : “তুমি এজন্য যুদ্ধ করেছো যে লোকে তোমাকে বলবে কত বড় একজন শক্তিশালী ও বীর যোদ্ধা তুমি!” লোকে তার প্রশংসা করেছে, কিন্তু সে আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করেনি, সুতরাং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।

এসব কিছুই আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে যে যদি হৃদয় অসুস্থ হয়, দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, বড় বড় সৎকর্মও কোন কাজে আসবে না। সুতরাং হৃদয়ের প্রতি আমাদের গভীর মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজেদের হৃদয়ের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমাদের প্রচুর সময় দিতে হবে। যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর সিদ্দীকের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে মানুষকে বলছিলেন, তিনি বলেছিলেন;

“সে তোমাদের চেয়ে বেশী সালাত আদায় করে না বা রোযা রাখেনা, তোমাদের অনেকেই তার চেয়ে বেশী সালাত আদায় কর ও রোযা রাখ, কিন্তু তার হৃদয়ে এমন কিছু আছে যা গভীরভাবে প্রোথিত … তা হচ্ছে তার হৃদয়ে অবস্থিত ঈমান।”

এখানেই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। অতএব একজন মুমিনের কাছে মানব শরীরে ও অস্তিত্বে আর কোন যোগ্যতা থাকতে পারে না যে সম্পর্কে সে আরো অধিক সচেতন হবে। আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে এই দক্ষতা/যোগ্যতা ক্রিয়াশীল করার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। এ সম্পর্কে আমাদের খুব বেশী সচেতন হতে হবে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায়ই দুআ শুরু করতেন এভাবে :

“হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে যা উপকারী নয় এবং এমন হৃদয় থেকে যা ভীত নয়।”

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি মানুষের সাথে খুবই নম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর স্ত্রীরা বলেছেন যে তাঁরা এমন কোন ঘটনার কথা মনে করতে পারেন না যেখানে তিনি তাঁদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলেছেন বা তাঁদের আঘাত করেছেন। তিনি তাঁর নম্রতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। এবং আল্লাহ এই গুণটিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। সূরা আলে-ইমরানে আল্লা বলেছেন :

“আল্লাহর দয়ার কারণেই তুমি তাদের সাথে নম্র। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিন-হৃদয় হতে, তাহলে তারা তোমার কাছে থেকে দূরে সরে যেতো।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩ : ১৫৯)

নবীদের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই এবং এই বৈশিষ্ট্য তাদেরও অবশ্যই অর্জন করতে হবে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ দেখায়। যেহেতু নবীদের জন্য এই গুণটি আবশ্যকীয়, এটি আমাদের জন্যও আবশ্যকীয়। যারা জ্ঞানের সন্ধানী তাদের জন্য এটি দরকারী, সব মানুষের জন্যই এটি দরকারী। আর পিতামাতার জন্যও ছেলেমেয়েদের প্রতি কোমল-হৃদয় হওয়া বাঞ্ছনীয়।

হৃদয়ের কোমলতা এমন একটি বিষয় যাতে আমরা প্রচুর সময় দিলেও যথেষ্ট হবে না। একবার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল-আকরা বিন হারিস এর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তার একটি বাচ্চাকে কোলে বসিয়ে আদর করে চুমা দিলেন। আল-আকরা বলল : “আমার আরও দশটি ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু আমি কখনো তাদের কাউকে চুমা দেইনি।” এটি ছিল একটি গর্বের বিষয়, পৌরুষ – যা কোমল নয়, কঠোর। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া সরিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমার কি করার আছে!” তিনি আরো বললেন, “যে অন্যকে দয়া করে না সে দয়া পাবে না।” সুতরাং বাচ্চাদের প্রতি কোমল আচরণ করা পিতামাতার জন্য জরুরী। যে ঘরে বাবা ছেলেমেয়েদের প্রতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল, সে ঘর সুখ ও আনন্দে ভরা থাকে।

দয়া এমন কিছু যা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। যারা জ্ঞানের সন্ধানী, যেহেতু দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক, জ্ঞানের সাথে যদি সে কোমল হৃদয়ের অধিকারী না হয়, তবে জ্ঞানের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা সম্ভব হয় না। যেমন হাসান আল-বসরী বলেছেন, “যদি কেউ জ্ঞান অনুসন্ধান করে, তা তার চেহারা, হাত ও জিহবায় এবং আল্লাহর প্রতি তার বিনয়ে প্রকাশ পাবে।” এর বিপরীত কথাটিও সত্য যে কোন কিছুই জ্ঞানকে এবং দ্বীনের প্রতি আহ্বানের কাজকে ততটা নষ্ট করে না যতটা করে হৃদয়ের কাঠিন্য। যেখানে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, সেখানে জ্ঞান ব্যক্তির নিজেরও কোন উপকারে লাগে না বা সে তা দিয়ে অন্যেরও উপকার করতে পারে না।

হৃদয়ের কোমলতা সত্যিকার মুসলিমের বৈশিষ্ট্য। এর অনুপস্থিতিতে জীবন দুর্ভোগ ও অস্বচ্ছান্দ্যে ভরে যায়। এটা আল্লাহর ওয়াদা। যাদের হৃদয় কোমল নয় তারা দুর্ভোগময় জীবন যাপন করবে। যেমন সূরা আয-যুমারে আল্লাহ বলেছেন :

“যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯ : ২২)

তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা কুরআন শ্রবণ করে কিন্তু তারপরও তারা ভীত ও বিনীত হয় না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের চোখকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও আল্লাহর ভয়ে তা ক্রন্দন করে না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের কাছে আল্লাহর সতর্কবাণী পৌঁছানোর পরও তারা তাঁর বাণীর প্রতি শ্রদ্ধাবনতও হয় না। কঠিন-হৃদয় বিশিষ্ট হওয়া একটি অভিশাপ আর হৃদয়ের নম্রতা সৌভাগ্যের কারণ। জীবনের সমস্ত কাম্য বস্তুর অধিকারী হলেও কঠিন হৃদয়-সম্পন্ন ব্যক্তি কষ্ট ভোগ করে। আপাত দৃষ্টিতে সুখময় মনে হলেও  তা এক শূন্য জীবন — একাকীত্বে পূর্ণ। তারা মনে এবং অন্তের শান্তি পায় না, কারণ তাদের অন্তর আল্লাহর প্রতি কঠিন – আল্লাহকে বিশ্বাসের ব্যাপারে ও তার আনুগত্যের ব্যাপারে। সেজন্যই আল্লাহ বলেছেন, যে তাঁর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে দুদর্শাগ্রস্ত জীবন যাপন করবে।

“… যে আমার বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন, আর বিচার দিবসে আমরা তাকে উত্থিত করবো অন্ধ করে।” (সূরা তা-হা, ২০ : ১২৪)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেনম একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় শান্ত হয়।

“যারা বিশ্বাস করে, এবং যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে তৃপ্তি লাভ করে : নিঃসন্দেহে আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ শান্তি লাভ করে।”(সূরা রা’দ, ১৩ : ২৮)

                                                                                                                                                                       চলবে

Advertisements

বায়োগ্রাফি : তারিক রামাদান …………….

  • বায়োগ্রাফি

    (উত্তরাধুনিক মুসলিম মন  – এর দ্বিতীয় খন্ডে অন্তর্ভুক্ত হবে তারিক রামাদানের জীবনী। এই জন্য লিখা হয়েছে তার এই সংক্ষিপ্ত বায়োগ্রাফি। বাংলাদেশে তারিক রামাদানের যারা একনিষ্ঠ পাঠক তাদের পরামর্শ ও মতামতের জন্য এখানে লিখাটি ২ কিস্তিতে পোস্ট করা হলো।)

    এক.

    সমকালীন ইউরোপীয় ইসলামের বলিষ্ঠ স্বর, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, শাস্ত্রজ্ঞ ও মিডিয়া তারকায় পরিণত তারিক রামাদান একই সাথে ভক্তজনের নিবিড় ভালোবাসা ও উষ্ণ বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে তিনি ইসলাম সম্পর্কে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ধারণা ও মতামত সংস্কারের এক সংগ্রামী মিশন শুরু করেছেন। তারিক রামাদানের লেখা রসুল চরিতের নাম হচ্ছে In the footsteps of the Prophet : Lessons from the life of Muhammad. এখানে তিনি ভক্তি ও যুক্তির অপূর্ব সংমিশ্রণে যা বলতে চেয়েছেন তা হচ্ছে ইসলাম ও তার নবীর বাণী আজকের দিনের মুসলমানরা তাদের জীবনে কিভাবে সৃষ্টিশীল ও কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে।

    তিনি ইসলামী শাস্ত্রবিদদের দ্বারা এ যাবৎ ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হরব’ -এ পৃথিবীকে বিভাজনের ঐতিহ্যকেও সংস্কারের কথা বলেছেন।  তার কথা হচ্ছে পশ্চিমে মুসলমানরা প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্থ সংখ্যালঘু হিসেবে শত্রু ভূমিতে বসবাসের ধরণা বদল করে পশ্চিমা সমাজের দায়িত্ববান অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

    সংস্কৃতির প্রশ্নগুলোকে তারিক রামাদান অত্যন্ত কৌশলের সাথে সবার সামনে নিজের মত করে উপস্থাপন করেন এবং শুরু থেকেই তিনি এ ব্যাপারে দক্ষতার নজীর রেখেছেন।  ১৯৯৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি জেনেভায় ভলটেয়ারের বিতর্কিত Muhammad or Fanaticism নাটকের মঞ্চায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন।  ফলস্বরূপ নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ হয় এবং এভাবে একটি তারকার জন্ম লাভ ঘটে।

    অবশ্য তার সব কার্যক্রম একইভাবে এগোয় নি।  সুইজারল্যান্ডের কলেজ ডি সোসুরেতে শিক্ষকতার সময় তিনি ডারউইনের প্রস্তাবিত জীববিজ্ঞানের পাশে ইসলামী ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি জীববিজ্ঞানের উপর জোর দেন। এতে তার সহকর্মীরা বিব্রত হয়। তখন তিনি বলেন তিনি কখনো বর্তমানে প্রচলিত কারিকুলাম বাতিলের কথা বলেন নি। তিনি শুধু প্রচলিত ধারণার সাথে নতুন একটি ধারনা যোগ করেছেন।

    জন্মসূত্রে সুইস নাগরিক তারিক রামাদানের ভক্তরা ইউরোপ ছাড়িয়ে পুরো পশ্চিমা বিশ্বে আজ ছড়িয়ে পড়েছে।  তার যুক্তিশীল ও চিন্তামূলক বক্তৃতা শুনবার জন্য অসংখ্য তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে অসংখ্য নর-নারী অপেক্ষা করে। তিনি বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে যোগ দেন।  টিভিতে কথা বলেন এবং প্রাণবন্ত বিতর্কে অংশ নেন। শুধু তাই নয় ইউরোপের রাস্তায় রাস্তায় বিশ্বায়ন বিরোধী মিছিলে তিনি এক পরিচিত মুখ।  ম্যাকডোনাল্ড বিরোধী সমাজতন্ত্রীরাও তার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।  তার কায়েমী স্বার্থবিরোধী অবস্থান কখনো কখনো সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, তিউনেশিয়ার স্বৈরতন্ত্রী ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপকদের দারুণভাবে বিব্রত করেছে, যারা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লংঘনের সাথে জড়িত।  ফলে এসব দেশে তিনি অবাঞ্ছিত হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। শুধু তাই নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাসনীতিরও তিনি একজন সমালোচক।

    ফলে সেখানেও তার প্রবেশাধিকারকে সংকুচিত করে দেয়া হয়েছে। তারিক রামাদান একান্তভাবেই ইউরোপের সন্তান ও ইউরোপের সৃষ্টি।  ইউরোপের ভাষা ও সংস্কৃতি যেমন তার একান্ত নিজস্ব তেমনি তিনি তার ইসলামী আত্মপরিচয় নিয়েও গর্বিত। তিনি প্রথাগত আলেম বা বুদ্ধিজীবীদের মত নন।  মুসলিম দুনিয়ায় বড় বড় আলেম আছেন যারা কোরআন-হাদীসে বিপুলভাবে পারদর্শী হলেও সমকালীন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন ও কূটনীতিতে তেমনভাবে সফল নন।  তাছাড়া আধুনিককালে মানুষের জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্খা, মনস্তত্ব, কর্মকৌশল আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও কঠিন।  মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মচর্চা ক্রমাগতভাবে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হচ্ছে তাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দ্বারা।  বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সমস্যার ধরণ ও বৈচিত্র ঠিক মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মত নয়।  এ বাস্তবতায় সনাতনী পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে কাংখিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।  তারিক রামাদানকে বুঝতে হলে এই প্রেক্ষাপটকে আমাদের মনে রাখতে হবে এবং এই প্রেক্ষিতেই তার উত্থান ঘটেছে নতুন কালের নিশান বরদার হিসেবে।

    দুই.

    তারিক রামাদানের জন্ম সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, ১৯৬২ সালের ২৬ আগস্ট।  তারিকের পিতার নাম সাঈদ রামাদান ও মাতা ওয়াফা আল বান্না।  তারিকের মাতামহ ছিলেন মিশরের বিখ্যাত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্না।  তারিকের পিতা সাঈদ রামাদানও ছিলেন প্রথিতযশা ইসলামবিদ ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী।  একই সাথে ব্রাদারহুডের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। এই কারণে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দুল নাসের তাকে সুইজারল্যান্ডে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন।

    সুইজারল্যান্ডেও সাঈদ রামাদান ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গড়ে তোলেন। এখানে তিনি ১৯৬১ সালে জেনেভা ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন যেটি একই সাথে মসজিদ, থিংক ট্যাংক ও কম্যুনিটি সেন্টার হিসেবে কাজ করে।  তার আর একটি পরিচয় হলো তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সামাজিক ও ইসলামিক অ্যাকটিভিস্ট ম্যালকম এক্সের একজন পরামর্শদাতা ও মুরব্বী ছিলেন।  ১৯৬৫ সালে ম্যালকম এক্স হজ্ব পালন করে দেশে ফেরার পথে জেনেভায় কয়েকদিনের জন্য সাঈদ রামাদানের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সেখানে দীর্ঘ আলাপচারিতার পর সাঈদের কাছেই ম্যালকম প্রথমবারের মতো ইসলামের শ্বাশ্বত বাণী আত্মস্থ করেন। এ সব কথা ম্যালকম তার শেষ জীবনে সাঈদের কাছে লেখা এক চিঠিতে অকপটে স্বীকার করেছেন।  জেনেভায় যেমন তারিকের বেড়ে ওঠা তেমনি এখানেই তার বিদ্যাচর্চার সূত্রপাত। তিনি জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্ডারগ্রাজুয়েট, মাস্টারস ও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।  মাস্টারসে তিনি দর্শন ও ফরাসি সাহিত্য পড়েন।  মাস্টারসে তার ডিসারটেশনের শিরোনাম ছিল The Notion of Suffering in Neitzsche’s Philosophy পিএইচডি ডিসারটেশনের সময় তিনি এটিকে সম্প্রসারিত করেন এবং নতুন শিরোনাম দেন Nietzsche as a Historian of Philosophy.4

    জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ও ইসলামি শাস্ত্রেও তিনি পিএইচডি করেন।  তার বিশেষজ্ঞতার বিষয় হলো ইসলাম ও ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, রাজনীতি ও আন্ত:ধর্ম সংলাপ । ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর লেখাপড়া ও গবেষণার জন্য তিনি কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন বেশ কয়েক বছর।  আল আজহারে মেধাবী তারিক পাঁচ বছরের কোর্স মাত্র ২০ মাসে শেষ করেন এবং একই সাথে ৭টি ইজাজাহ (Certificate) লাভ করেন, যা তাকে ধ্রুপদী ইসলামী জ্ঞানের জগতে অনায়াস প্রবেশের অধিকার দেয়। সুইজারল্যান্ডের কলেজ ডি সোসুরেতে শিক্ষকতা দিয়ে তার পেশাগত জীবনের যাত্রা আরম্ভ। একই সাথে তিনি ফ্রাইব্রুগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম ও দর্শনের প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন।  কিছুদিন জেনেভায় চাকরীর পর ২০০৫ সালে তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টনি কলেজে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যোগ দেন। ২০০৭ সালে তিনি নেদারল্যান্ডের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক হয়ে। একই সাথে তিনি রটারড্যামের ইরামুস বিশ্ববিদ্যালয়ে Identity and Citizenship এর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। ২০০৯ সালে ইরামুস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে অধ্যাপকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় এই কারণে ইরানী টিভিতে তিনি একটি অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। রামাদান এই ঘটনাকে Islamophobic I Politically Charged হিসেবে উল্লেখ করেন। ৫ একই বছর (২০০৯) তারিক রামাদান আবার ফিরে যান অক্সফোর্ডে।  এবার তাকে অফার করা হয় ‘হামাদ বিন খলিফা আল সানি’ অ্যান্ডাউড চেয়ার। এ চেয়ার বিশেষ করে সৃষ্টি করা হয়েছিল সমসাময়িক ইসলামিক ও ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের জন্য।

    সুইজারল্যান্ডে থাকতে তরুণ বয়সে তারিক ‘মুভমেন্ট অফ সুইস মুসলিম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠণের উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে সুইসদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া। এসব সংলাপে তারিক সরাসরি অংশ নিতেন। ইসলামী চিন্তার জগতে এভাবেই শুরু হয় তারিকের অভিযাত্রা। শুধু তাই নয় তরুণ বয়সে তারিক বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের সাথেও নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এবং সুইসদের সাথে মিলিত ভাবে কাজ করেন। এসব সামাজিক কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল শিল্পোন্নত দেশগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত বৃদ্ধদের সম্পর্কে সচেতন করা। তার এ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও অনেকখানি স্বীকৃতি পায়। তরুণ শিক্ষক হিসেবে এসব বিষয়ে তিনি ছাত্রদের সচেতন করবার জন্য লেখেন তিনটি বই: The Split Hour Glass, In Red, In the Margin & A Common Point, Difference.6

    পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে নিয়োগ দেয় ধর্মবিষয়ক একজন উপদেষ্টা হিসেবে। এই সূত্রে তিনি ‘ইইউ কমিশন অন ইসলাম এ্যান্ড সেকুলারিজম’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সময়ে সময়ে উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ধর্মীয় বিষয়ে একটি টাস্কফোর্সে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তিনি ব্রাসেলস ভিত্তিক ‘থিংক ট্যাংক ইউরো মুসলিম নেটওয়ার্ক’ এর সভাপতি। তিনি একই সাথে কাতার ভিত্তিক রিসার্চ ‘সেন্টার ফর ইসলামিক লেজিসলেশন এন্ড এথিকস’এর পরিচালক।  তার দাওয়া সংক্রান্ত প্রায় ১০০ সিডি আছে যার দুনিয়া জোড়া খ্যাতি ও শ্রোতা রয়েছে।  ২০০৮ সালে বৃটেনের প্রসপেক্ট ম্যাগাজিন একটি অনলাইন জরিপের মাধ্যমে তাকে দুনিয়ার প্রভাবশালী ১০০ জন চিন্তকের মধ্যে ৮ম স্থান দেয়।

    তারিক তার এই বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এক সময় মুসলিম বিশ্বের স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রাখা শুরু করেন।  যার ফলে ২০০৯ সালে তাকে মিশর, তিউনেশিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, সৌদি আরবে অবাঞ্ছিত (Persona non grata) ঘোষণা করা হয়।  তারিকের মত স্বাধীনচেতা ব্যক্তির জন্য এটাই হয়তো স্বাভাবিক। শুধু তাই নয় তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের একজন বড় প্রবক্তা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এমনকি স্বৈরাচারী মুসলিম রাষ্ট্র প্রধানদের প্রতি তিনি স্পষ্ট কথা বলতেও দ্বিধা করেন নি।  যার কারণে এখানকার সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করেছে।  ইসরাইলকে রক্ষা করতে মানবাধিকারে ছাড় দেয়ায় তিনি ফরাসি ইহুদি বুদ্ধিজীবীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং এদেরকে বলেছেন – Knee jerk defenders of Israel.7

    ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নটরডাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে লুস অ্যান্ডাউড চেয়ার প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মার্কিন ভিসা না পাওয়ায় তিনি এ চাকরিতে যোগ দিতে পারেন নি। ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের সমালোচনা করায় ২০০৪ সালে বুশ প্রশাসন তার উপর ভিসা এমবারগো দিয়ে রাখে। এ সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তারিকের হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা নিজ খরচে আইনী লড়াই শুরু করে।  অবশেষে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে তার জয় হয়।  ২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন সরকার তার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

    ২০০৪ সালে তিনি ফ্রান্সের মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরিধানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারীর প্রেক্ষিতে আবার বিতর্কে জড়িয়ে যান। তিনি সেকুলারিজমের নামে স্কুলে ও পাবলিক প্লেসে ইসলামী অনুশাসনের উপর  ক্রাক ডাউনের ঘোর বিরোধী। এ নিয়ে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজীর সাথে তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তিনি হিজাব নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেন এবং ধ্রুপদী ইউরোপের উদার নৈতিক সংস্কৃতি রক্ষার আহ্বান জানানঃ

    Rights are rights, and to demand them is a right … the right of Muslim girls to choose for themselves whether to cover up is a classic libertarians necessity.8

    তিন.

    তারিক রামাদান কৃত রসূল চরিত In the Footsteps of the Prophet  মূলত পশ্চিমা পাঠকদের জন্য লেখা।  ইংরেজি ভাষায় লেখা অন্যান্য রসূল চরিতের পাশে এর স্বাদ পাঠকের কাছে একটু অন্যরকম লাগতে পারে।  শিল্পী ক্যাট স্টিভেনসের (বর্তমানে ইউসুফ ইসলাম) লেখা রসূল চরিতে দেখা যায় একজন দায়ীর (Preacher) অনুভব। কারেন আর্মস্ট্রং লিখেছেন বুদ্ধিবৃত্তির শক্ত চাদর মুড়ে ।  মার্টিং লিংসের ভাষার মধ্যে আছে সুফিবাদী অন্তর্লীনতা।  তারিক লিখেছেন পশ্চিমের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য যারা সহজে রসূলের বাণীকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

    তারিকের কাছে রসূল হচ্ছেন একজন বিনয়ী, অনুভূতিসম্পন্ন ও মহানুভব ব্যক্তি।  তিনি খোদাপ্রেমী অথচ ধর্মান্ধ নন।  তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন কোন কিছুর বাড়াবাড়ি বা অতিরঞ্জন কাম্য নয়।  মধ্য পন্থাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ।  রসূল তার অনুসারীদের হৃদয় দিয়ে জয় করার পক্ষপাতী ছিলেন।  জোরপূর্বক ধর্মান্তরে তার আস্থা ছিল না। মদীনার স্থানীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।  রসূলের হিজরতকে তারিক রামাদান দেখেছেন সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় সংশ্লেষ হিসেবে ।  ইসলামের বৈশ্বিক নীতিকে অক্ষুন্ন রেখেও নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা সম্ভব এর নজীর মদিনায় মক্কা থেকে আগত মুহাজিররা সম্ভব করে তুলেছিলেন।  তারিকের কাছে রসূল (স.) প্রতিভাত হয়েছেন সমতার প্রতীকরূপে যিনি ছিলেন নীতির প্রশ্নে অটল অথচ অন্যের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিতে তার কুণ্ঠা ছিল না।  রসূলের আশে পাশে অনেক নারী-পুরুষ ছিলেন যাদের অনেকে তার বিশ্বাসের সহযাত্রী ছিলেন না।  কিন্তু তিনি তাদের নৈতিক ও মানবিক সামর্থ্যকে অস্বীকার করেন নি।

    তারিক বর্ণনা দিচ্ছেন রসূল তার প্রথম স্ত্রী খাদিজাকে সব সময় যে কোন দাওয়াতের সময় সঙ্গে রাখতেন । এভাবে তিনি লিঙ্গ বৈষম্যের (Gender Segregation) বিরুদ্ধে সেই কালে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। হিজরতের পর রসূল (স.) যে মদিনা সনদের আওতায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন তারিক রামাদান সেটিকে দেখেছেন সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি হিসেবে।

    রসূলের জীবন থেকে তারিক রামাদান তিনটি শিক্ষা নিয়েছেনঃ

    -ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও জুলুমের অবসান।

    -ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নীতি ইসলামের ভিতর ও বাহির উভয় স্থান থেকেই আসতে পারে।

    -ইসলামী নীতি কোন বদ্ধ জলাশয় নয়। বরং এটি একটি বৈশ্বিক নীতির অনুসরণ করে যা কিনা অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের মৌল ভাবনার সাথে একাত্মতা পোষণ করতে পারে।৯

    তারিক রামাদানের রসূল চরিত পশ্চিমা পাঠকদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা এ বই থেকে যেমন তৌহিদের  বিশ্ব ভাবনায় অনুপ্রাণিত হবে তেমনি সমকালীন সমাজের ভোগবাদ, অস্থিরতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সাংবাদিক আয়ান বরুমা লিখেছেন তারিকের বাণী এ কালে যেন Alternative to Violence – সন্ত্রাসের বিকল্প ।১০

    চিন্তা ভাবনার জায়গা থেকে তারিক ঠিক জ্যা জ্যাক রুশোর সাথে একমত হননি, যিনি বলেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাস রাজনৈতিক আনুগত্যকে বিপদে ফেলে দেয়। তারিক বরং জন লকের সাথেই বেশি একাত্মতা বোধ করেন কারণ তিনি বলেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাস জাতীয় নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। তারিক সব সময় তার বক্তৃতাগুলোতে সামাজিক সমস্যার ইসলামীকরণের ধারণার বিরুদ্ধে মত দেন। কারণ তিনি মনে করেন মুসলমান হিসাবে নয়; বরং নাগরিক হিসাবে এ সমস্যাকে আমাদেরকে দেখতে হবে। তাহলেই মুসলমান তরুণরা গাড়ী পোড়ানোর চেয়ে ভোট বিপ্লবে এগিয়ে আসবে।

    তারিক রামাদান আরো মনে করেন সুইসাইড বম্বিং ও ভায়েলেন্স কোনো যুদ্ধের অংশ হতে পারে না। সে যে যুদ্ধই হোক, যে অবস্থাতেই হোক। এটা পরিষ্কার ভাবে ইসলাম নিষিদ্ধ কাজ। মানুষ কেন সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয় তার মোটিভেশন বোধগম্য হলেও তিনি কৌশল হিসেবে টেররিজম ও ভায়োলেন্সকে ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিপূর্ণ মনে করেন না। মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের জুলমবাজী ও পশ্চিমাদের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে যে গলদ আছে তার থেকেই সন্ত্রাসবাদের উপস্থিতি- এ ব্যাপারটা তার কাছে যথেষ্ট পরিষ্কার। কিন্তু এর থেকে উত্তরণের পথ কি তা তিনি হয়তো জানেন কিন্তু পশ্চিমের সংখ্যালঘু সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না। পশ্চিমের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি এর একটি ফয়সালা চান। সন্ত্রাসবাদকে তিনি মনে করেন নৈতিকভাবে এটি  নিন্দনীয় কিন্তু রাজনীতির সাথে এর যোগসূত্র আছে।

    তারিক রামাদান মনে করেন একটি যুক্তিশীল কিন্তু ঐতিহ্যবাদী ইসলামী ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধ ইউরোপীয় আলোকদীপ্তির (Enlightenment)  চিন্তাভাবনার চেয়ে কম বিশ্বজনীন নয়। সেদিক দিয়ে বিচার করলে তারিকের চিন্তা ভাবনা ঠিক সেক্যুলার নয় কিন্তু একই সাথে পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী নয়। তার রাজনীতি সন্ত্রাসবাদের বাইরে একটি বিকল্প পথের সন্ধান দেয় যা কিনা পারস্পরিক সহাবস্থান ও বহুত্ববাদী মূল্যবোধের পক্ষে সহায়ক

    চার.

    তারিক রামাদানকে বুঝতে হলে একটি সংখ্যালঘু সমাজের দুঃখ, বিপর্যয়, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার দিকগুলোকে আমাদের নাড়াচাড়া করতে হবে। এটা যে কোন দেশের সংখ্যালঘু সমাজের সমস্যা। পশ্চিমের মুসলিম সমাজও এর থেকে দূরবর্তী কিছু নয়।  তারিক খুব কাছে থেকে পশ্চিমের মুসলমানদের সমস্যাগুলোকে বুঝার চেষ্টা করেছেন। পশ্চিমের মুসলমানরা প্রধানত অভিবাসী মুসলমান। এখন এদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সংখ্যা বাড়ছে।  তারিক মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বে এসব মুসলমানরা যা কিছুর চর্চা করেন তার অনেক কিছু আপাতদৃষ্টিতে ধর্মীয় মনে হলেও এর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।  এগুলো নিতান্তই তাদের আঞ্চলিক সংস্কৃতি যা অভিবাসী হওয়ার সময় তারা নিজ দেশ থেকে বহন করে এনেছিলেন।  তারিক মনে করেন এসব আঞ্চলিক সংস্কৃতি ঝেড়ে ফেলে পশ্চিমের মুসলমানদের উচিত পশ্চিমের সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা করে এখানে বসবাস করা। এদিক দিয়ে তারিককে বলা যায় Western Islam এর প্রবক্তা। তারিক মনে করেন ধর্ম বিশ্বাস এক হলেও স্থান বিশেষে এর ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে এবং সংস্কৃতিতেও ভিন্নতা আসতে পারে।  তিনি লিখেছেনঃ

    Western Islam is a reality, just like African, Arab or Asian Islam. Of course there is only one single Islam as far as fundamental religious principles are concerned, but it includes a variety of interpretations and a plurality of cultures. Its universality indeed stems from this capacity to integrate diversity into its fundamental oneness.11

    এখানে তারিকের কথা হচ্ছে ধর্মের সাথে সংস্কৃতির পার্থক্যটা আগে বুঝা দরকার। এটা সত্য- সংস্কৃতি ছাড়া যেমন ধর্ম হয় না তেমনি ধর্মের নির্যাসমুক্ত সংস্কৃতিও একরকম অনুপস্থিত। কিন্তু তাই বলে ধর্ম ও সংস্কৃতি পুরোপুরি এক জিনিস নয়।  তিনি আরো মনে করেন, নাগরিকত্ব ও নাগরিক অধিকারের চর্চা এবং ধর্ম ও ধর্ম পালন এক নয়।  যেমন যে কোনো দেশের নাগরিক হিসাবে মুসলমানদেরও সে দেশের আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ধর্মের সাথে এর কোনো সংঘাত নেই।  কিন্তু অনেকে বুঝতে না পারার কারণে এর মধ্যে একটা বিতর্ক তৈরি করে ফেলে।  তারিক এ ব্যাপারে পশ্চিমা মুসলমানদেরকে সব সময় সজাগ থাকতে পরামর্শ দেন।

    তারিক পশ্চিমা ইসলামের (Western Islam) যে নতুন বিশ্ব নির্মাণ করেছেন তার তাত্ত্বিক রসদ তিনি দিয়েছেন তার লেখা ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত To be a European Muslim এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত Western Muslims and the Future of Islam নামের দু’টি বইয়ে।  এখানে তিনি মুসলিম আলেমদের বিশ্বকে এতকালের দ্বিমাত্রিকভাবে বিভাজন করার ধ্রুপদী রীতিকে ভাঙতে চেয়েছেন।  মুসলিম আলেমরা দারুল ইসলাম (Abode of Peace) ও  দারুল হরবের (Abode of War) যে দ্বিপদীয় বিভাজন করেছিলেন তারিক বলছেন এ রকম কোনো কিছু কুরআনে নেই।  তারিকের মতে এ দুটোর মাঝখানে আরেকটি অবস্থান থাকতে পারে যাকে তিনি বলেছেন দারুল দাওয়া (Abode of Invitation)। তিনি পশ্চিমের মুসলমানদের বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে সেই সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার উপর জোর দেন। তিনি মনে করেন পশ্চিম দারুল হরব নয়, দারুল ইসলামও নয়। এটা হচ্ছে দারুল শাহাদাহ (Abode of Testimony) । তারিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লাহ পৃথিবীতে মুসলমানদের পাঠিয়েছেন অন্য সবার উপর সাক্ষীরূপে ।  তিনি অভিবাসী মুসলমানদের পাশ্চাত্যের সাথে একাত্মতার উপর জোর দেন।  মুসলিম ব্রাদারহুডের চেয়ে এক্ষেত্রে তিনি গুরুত্ব দেন হিউম্যান ব্রাদারহুডের উপর।  পশ্চিমে মুসলমানদের দায়িত্ব হওয়া উচিত সেদেশের সরকারের কাছে প্রোটেকশনের দাবি নয় বরং কনট্রিবিউশনের সুযোগ চাওয়া। তিনি মুসলমানদের সংখ্যালঘু হিসেবে সেখানে প্রান্তিক (Marginalized)  ও গুটানো (Ghetto) অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নাগরিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানান। তারিক লিখেছেনঃ

    আলেমদের ব্যবহৃত পুরনো ধারণার কথা এখন বাদ দিলেও সমসাময়িক অবস্থার আলোকে ইসলামী সূত্রের অনুসরণ করে পশ্চিমা দেশসমূহের মুসলমানরা নিজের বাড়ীতে বসবাস করছে এমন ধারণা পোষণ করতে পারে।  বিশ্ব অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলছে। পশ্চিমা দেশে শাহাদা এখন প্রচারিত হতে পারে, শাহাদার প্রতি সম্মান জানানো যেতে পারে ও অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এর দ্বারা শুধু অনুমতি বা বৈধতার কথাটিই বলা হয়েছে তা নয়, দায়িত্ববোধের কথাও বলা হয়েছে। আবাসিক বা নাগরিক হিসেবে শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাসের সাথে সাথে মুসলমানরা তাদের নিজের সত্তা রক্ষা করবে, আর একই সাথে সাথী নাগরিকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেবে।  শাহাদা আল ইসলামের দ্বিবিধ প্রেক্ষিত কে একাকী বসবাস করে অর্জন করা যাবে না।  পারিপার্শ্বিক সমাজ হতে দূরে থেকে আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখেও তা অর্জন সম্ভব হবে না আসলে যা হচ্ছে তা প্রয়োজনের বাইরেই হচ্ছে (স্থানীয় হতে জাতীয় এমনকি মহাদেশও এর সাথে জড়িত). ইউরোপে মুসলমান হওয়ার জন্য প্রয়োজন সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ভূমিকা রাখা।  ইউরোপে মুসলমানদের কোন ভবিষ্যৎ থাকবে না যদি তারা তাদের পরিবেশকে মেনে নিতে না পারে। ১২

    তারিক রামাদান আমরা বনাম তারা (We versus They) ডকট্রিনে বিশ্বাস করেন না। তার মতে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে প্রতিবেশী ও কমিউনিটির প্রতি সঠিকভাবে নাগরিক দায়িত্ব পালনও ইসলাম ধর্মের একটি অংশ। পশ্চিমা দেশগুলো নাগরিকদের যে অধিকার ও দায়িত্ব দিয়েছে তারিক মনে করেন তা কিন্তু কুরআনের নীতির পরিপন্থী নয় ।  উল্টো মুসলিম দেশের শাসকরা সেখানকার নাগরিকদের এগুলো দিতে অনেক ক্ষেত্রেই প্রস্তুত নয়।  মুসলমান সমাজে স্বৈরাচারী শাসক, অগণতান্ত্রিক পথ ও পদ্ধতি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার লংঘনের কারণে পশ্চিমাদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ইমেজ গড়ে উঠেছে।  তিনি এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন।  তিনি মনে করেন মুসলমানদেরকেই এর দায় নিতে হবে এবং এর থেকে উত্তরণের পথ ধীরে ধীরে হলেও বের করে আনতে হবে।

    তারিকের মতে পশ্চিমা তরুণ মুসলিম প্রজন্ম যত বেশি সে দেশের ভাষায় ইসলাম ও ইসলামের দর্শণ, শিল্প, সংস্কৃতির চর্চা করবে, গবেষণা করবে, লেখালেখি করবে ততই তারা পশ্চিমে বসে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।  তিনি আরো মনে করেন পশ্চিমের মুসলমানদের ডিফেনসিভ অবস্থান পরিত্যাগ করে অভিবাসী দেশের মানুষের সামনে নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে তুলে ধরতে হবে।

    পশ্চিমা মুসলমানদের নিয়ে তার ভাবনা চিন্তাকে এক ধরণের সংস্কার চিন্তাই বলা যায়। তিনি নিজেও হয়তো এরকম মনে করেন। তার ভাষ্য উদ্ধার করছিঃ

    This reform movement requires, as we have said several times, a true intellectual revolution that will make it possible to be reconciled to the universality of Islamic values and to stop considering overselves a marginalized minority, on the brink of adapting or integrating, and trying to no more that protect ourselves from an environment we consider dangerous. In order to achieve this, Western Muslims need to free themselves of their double inferiority complex – in relation to the West (and the domination of its rationality and technology) on the one hand and in relation to the Muslim World (which alone seems to produce the great Arabic-speaking spirits of Islam who quote the texts with such ease) on the other. We shall have to liberate ourselves from these faults by developing a rich, positive, and participatory presence in the West that must contribute from within to debates about the universality of values, globalization, ethics, and the meaning of life in modern times.১৩

    দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা মুসলমানদের জন্য তাদের নতুনতর পরিস্থিতি ও অবস্থার সাপেক্ষে তিনি নতুন ফিকহ (Western Fiqh) তৈরী করার কথা বলেছেন। এজন্য তিনি ইজতেহাদের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন এবং নিজেও ইজতেহাদ করেছেন। এই সংখ্যালঘু ফিকাহর কথা শুনে হয়তো অনেকে আঁতকে উঠতে পারেন কেননা এতে ইসলামের বিশ্বজনীনতা ক্ষুন্ন হতে পারে। কিন্তু কথা হচ্ছে ইসলাম সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে অস্বীকার করেনি। এই বৈচিত্রের কারণেই মানুষের জীবনধারা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম হয়। তাই ফিকাহরও রূপ বদল হতে পারে। কারণ মানুষের জন্য ফিকাহর বিকাশ ও উদ্ভব।  তবে  ফকীহদের দেখতে হবে সংস্কৃতি নির্বিশেষে কোন ফিকাহই যেন ইসলামের মৌলিক ভাবকে অতিক্রম না করে।  তারিক রামাদানের এই ইজতেহাদী ভাবনা চিন্তাকে চমৎকার বলতেই হবে কারণ এর মধ্যে অনেকগুলোই আছে উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন।  তবে তার চিন্তা ভাবনার পক্ষে সমকালীন মুসলিম দুনিয়ার ইসলামী পন্ডিতদের অন্ততঃ একটা বড় অংশের সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে।  না হলে যুক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন সকলের গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া সেটির কার্যকারিতা কমে যায়।  তারিক রামাদান কেন পশ্চিমা মুসলমানদের জন্য এই বিকল্প বয়ান তৈরী করতে গেলেন।  এর সামাজিক কার্যকারণ খুঁজতে গেলে বলতে হবে প্রত্যেক সংখ্যালঘু সমাজ সেখানকার সংখ্যাগুরুত্বের চাপে এক ধরণের আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে। এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য তারা শিকড়ের সন্ধান করে।  নিজের ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতিকে নতুন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে যাতে তারা হীনমন্যতা জয় করতে পারে।  তারিক রামাদান সে কাজটিই করেছেন। সে দিক দিয়ে বলা যায় তিনি একজন আত্মানুসন্ধানী পন্ডিত।  তবে এরকম উদাহরণ বে-নজীর নয়।  আফ্রিকা ও ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ক্ষেত্রেও এ ধরণের সংকট তৈরী হয়েছিল।  দারুল হরব ও দারুল ইসলাম বিতর্ক বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিম সমাজকে সেদিন দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল।  প্রথিতযশা আলেম, পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ এমনকি সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ এসব বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিল। সৈয়দ আহমদ খান, সৈয়দ আমীর আলী, মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী প্রমুখ ব্রিটিশ ভারতকে দারুল ইসলামই মনে করতেন। দেওবন্দের মশহুর আলেমরা অথবা ওহাবী ফরায়েজী আন্দোলনের নেতারা এটাকে মনে করতেন দারুল হরব।  এজন্য তারা ব্রিটিশের সাথে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন।  তারিক রামাদান কি তাহলে ইউরোপের সৈয়দ আহমদ খান অথবা সৈয়দ আমীর আলী? তারিকের উপস্থাপনা নতুন, তার সময়, প্রেক্ষাপট, চিন্তাভাবনার গঠন সৈয়দ আহমদ খান ও সৈয়দ আমীর আলী থেকে অনেকাংশেই পৃথক। তারপরেও বলতে হবে আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে বেরিয়ে এসে নিজ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়ার জন্য তাদের ভাবনা চিন্তার ক্ষেত্রে কোথাও একটা পরম্পরা আছে।  ইতিহাসতো পরম্পরা ছাড়া এগুতে পারে না।  এক্ষেত্রে তারিক শুধু পরিভাষাগত পরিবর্তন এনেছেন এবং ইসলামি শাস্ত্র দিয়ে তিনি তার যুক্তিকে সিদ্ধ করতে চেয়েছেন।  কিন্তু তাৎপর্যের দিক দিয়ে সৈয়দ আহমদ খান কিংবা সৈয়দ আমীর আলীর চিন্তার সাথে তারিক রামাদানের চিন্তার  একটি সাযুজ্য বিদ্যমান।

    পাঁচ.

    তারিক রামাদানকে তাই বলে পুরোপুরি Eurocentric (ইউরোপ কেন্দ্রিক) বা Westocentric (পশ্চিম কেন্দ্রিক) বুদ্ধিজীবী বলা সংগত নয় মোটেই। ইউরোপ বা পশ্চিমের সীমানার বাইরে এসে তিনি মুসলিম উম্মাহর সমস্যা ও সংকটগুলো নিয়েও বিস্তর নাড়াচাড়া করেছেন। মুসলমানদের হতাশা ও বিপর্যয় যেমন তাকে বেদনার্ত করে তেমনি তাদের সাফল্যে তিনি ঐকাত্ম বোধ করেন। বিশেষ করে আধুনিকতা, বিশ্বায়ন ও আধিপত্যবাদের প্রেক্ষাপটে মুসলমানরা কিভাবে নিজেদের স্বকীয়তা অক্ষুন্ন রেখে বিশ্ব বিশ্বমঞ্চে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে, এসব তার চিন্তার বাতায়নে বারবার ধাক্কা দিয়েছে।  মুসলিম উম্মাহর অংশীদার হিসেবে ভিতর থেকে তিনি এই সংকটের চেহারা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং ইসলামী বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ইতিহাসের রস নিংড়ে তিনি এই সংকট সমাধানের কতকগুলো সূত্রের কথা বলেছেন। এসব ব্যবস্থা পত্রের সাথে অনেকের সম্মতি নাও থাকতে পারে।  কিন্তু সেটা বড় বিষয় নয়। দেখার বিষয় হচ্ছে তিনি সমাধানের একটি মডেল হাজীর করেছেন। আরেকটি জিনিস এখানে ভাবার বিষয় হচ্ছে তারিকের উপস্থাপনা সম্পূর্ণ ইউরোপীয় বা পশ্চিমা ।  পশ্চিমের পরিভাষাগুলোকেই তিনি অনায়াসে ইসলামী জগতে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলেন এবং ইসলামী অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সেগুলোর সমাধান খোঁজেন।  কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নির্বিচারে পশ্চিমা বয়ানকে ইসলামীকরণ করতে গেলে মুসলিম সমাজে এর সুফল ঠিকমতো ফলবে কিনা তা একটি বিতর্ক সাপেক্ষ ব্যাপার। অবশ্য তারিক এ ব্যাপারটি পুরোপুরি অনবহিত এমন বলা যায় না।

    সমকালীন মুসলমানদের সংকট ও সমাধান নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বই লিখেছেন। এগুলো হচ্ছে  Islam, the West and the Challanges of Modernity ও Radical Reform: Islamic Ethics and Liberation.

    এখানে তারিক নিজে সংস্কারকের ভূমিকায় দাঁড়িয়েছেন। তার কথা হচ্ছে বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে ইসলামের পার্থক্যটা মৌলিক। সুতরাং এই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ কোনো রকমের সংস্কার (Adaptive Reform) করে মুসলমানদের বীর্যহীনতাকে দূর করা যাবে না। বরং যা করতে হবে তা হলো ইসলামের মধ্যে এমন একটা বিপ্লবী সংস্কারের (Radical Reform) আয়োজন যা কিনা মুসলমানদের পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করবে। তারিকের কথা উদ্ধার করছি:

    Against the ‘hidden’ polytheisms that make out of power, nation, science, technique, money, pleasure and comfort as many gods to which is devoted a publicity based and financial cult, the affirmation of the rabbaniyya is a true enterprise of liberation, a spiritual liberation, if ever there was one. Islam is also this dimension; it is especially this dimension and the call addressed to the West that should be heard by all people of good-will. This is not in view of conversion but rather with a concern for an engagement to unite all the forces of those who, in the name of God or their conscience, refuse the new world disorder so as to preoccupy themselves instead with values and finalities. 14

    পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশ্বের যে ক্ষতি করেছে, মানুষের মধ্যে যে মানবিক বিচ্যুতি ঘটিয়েছে তার থেকে বের হয়ে আসতে হলে মুসলমানকে আজ ইসলামের মৌলিক ভাবের জায়গায় দাড়াতে হবে। তারিক রামাদান সুষ্পষ্টভাবে আমাদের জানিয়েছেন এ সব কথা:

    The values of Islam call for fraternity, solidarity, respect for human dignity as well as respect for nature. Reinstated in their cultural compost, these nations find a dynamising symbolical force. These values are, by essence, opposed to individualism, exploitation, destruction of resources, the cult of technique and blind science. Will we know, in the West, how to see in Islam a safeguard against the drifts of a modernity whose evolution we can no longer control? Will the Muslims know how to make this link with God and their points of reference an advanced stronghold of the fight against injustice, destruction of the planet and ‘market monotheism’? Everything, absolutely everything, in the Quranic message invites them to do so.15

    এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝা দরকার ইসলামের মৌলিক ভাবের উপর দাঁড়াতে হলে আগে মুসলিম সমাজের বর্তমান অসুখ সারাতে হবে।  পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমালোচনা করার আগে নিজেকে আগে সমালোচনার উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। তারিক স্পষ্ট করে বলেছেন ইসলাম যে আজকে পশ্চিমা মিডিয়ার ভয়ঙ্কর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে এর অনেক কিছু হয়তো অতিরঞ্জিত, কিন্তু সবকিছুই অসত্য নয়।  মুসলমানদের ভ্রান্তি বৈরী পশ্চিমা মিডিয়ার জন্য সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? তিনি মুসলমান সমাজের কতকগুলো সমস্যার কথা বলেছেন যার থেকে বের হয়ে আসা জরুরী। যেমন:

    ১।             দারিদ্র্র্য ও অশিক্ষাঃ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলিম নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলোর সমাধান এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল মুসলিম শিশুর বুনিয়াদী শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করণ।

    ২.             স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাঃ এখন প্রায় সমস্ত মুসলিম দেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে জওয়াবদিহিতাবিহীন স্বৈরাচারী, সামরিক, বাদশাহী ও গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা। এরা কোনো না কোনো ভাবে পশ্চিমা শক্তি, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় অগ্রণী এবং নিজ জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনে ও তাদের উপর নির্বিচারে নিপীড়নে এদের দক্ষতা সীমাহীন। মুসলমানদেরকে এদের শিকল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সকল রকমের প্রচেষ্টা শুরু করতে হবে।

    ৩.             মুসলমানের বিপর্যয়ের জন্য পশ্চিমকে দোষী করার আগে নিজেদের ক্ষত ও ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে ও তার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে।

    ৪.             ইসলাম ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারী অধিকারের ব্যাপারটা একটা গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা অনেক ক্ষেত্রে অসদুদ্দেশ্যপূর্ণ হলেও মুসলিম সমাজে নারীদের অবস্থান কতকক্ষেত্রে অবশ্যই বৈষম্যমূলক। এটা শুধু পশ্চিমা মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে নয়, ইসলামী নীতির দিক দিয়েও এটি সমর্থনযোগ্য নয়। সুতরাং এ অবস্থার উত্তরণ জরুরী।

    ৫.             আজকের মুসলিম সমাজের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এবং ইসলামের মৌলিক তাৎপর্যের ভিত্তিতে ফিকহ্ প্রণয়ন করতে হবে।

    ৬.             সব ধরণের সন্ত্রাস এবং এর কার্যকারণ দুর করতে হবে।  অন্যথায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।১৬

    তারিক রামাদান তার বিপ্লবী সংস্কার (Radical Reform) বইয়ে লিখেছেন সময়ের প্রয়োজনে আইনকে যুগোপযোগী করতে হয় । অতীতের অন্ধ অনুসরণ (তাকলিদ) আইন বিকাশের পক্ষে বড় বাধা। আইনের বৃহত্তর তাৎপর্য যাকে বলা হয় মাকাসিদ আস শরীয়াহ (Higher objectives of law)- এটিকে সামনে রেখে নতুন সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য নতুন নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।  কিন্তু ইসলামী দুনিয়া বহুদিন হলো এই আইনের বিবর্তন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারেনি। তারিকের ভাষায়ঃ

    Contemporary Islamic ethics has become defensive, passive, behind the times, and isolated, and it by no means corresponds to the requirements of a religious and humanist conscience that ought, in keeping with its ideals, produce a visionary, committed, open ethics that questions the world, its order, its achievements, and its lapses and then devises and propses concrete modalities to transform it.১৭

    ইসলামী আইনের দুটো উৎস। একটি হচ্ছে প্রত্যাদিষ্ট বাণী (Revealed Text)  কুরআন ও সুন্নাহ, অন্যটি বিশ্বব্রহ্মান্ড (Universe)।  বিশ্ব যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টি তাই এর মধ্যে আছে খোদায়ী পরিকল্পনা বুঝার অনেক নিদর্শন। এই নিদর্শনগুলো হয়ে উঠতে পারে আইনের একটি উৎস।  কেননা এই নিদর্শন অতিক্রম করা আল্লাহর ইচ্ছা মাফিক নয়।  তারিকের মত হচ্ছে এ দুটি উৎসকে মূল ধরে এবং আজকের দিনের মুসলমানদের বাস্তবতাকে সামনে রেখে আইন প্রণয়ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের আক্ষরিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে আইনের উচ্চতম উদ্দেশ্যকে (মাকাসিদ আস শরীয়াহ) বিবেচনায় নিতে হবে।

    শরিয়ার মাকাসিদ হচ্ছে ধর্মের (দ্বীন) নিরাপত্তা, প্রাণের (নাফস) নিরাপত্তা, বুদ্ধির (আকল) নিরাপত্তা, পরিবারের (নসল) নিরাপত্তা ও সম্পত্তির (আমওয়াল) নিরাপত্তা। ফকীহদের আগে ঠিক করতে হবে কিভাবে আইন একালে মানুষের এই নিরাপত্তার প্রয়োজনকে পূর্ণ করে একটি ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে সহায়ক হয়।

    তারিক মনে করেন শরিয়ার প্রয়োগ মানে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়, এমনকি অক্ষরবাদীদের (literalist) মত ইসলামী ফৌজদারী আইন চাপিয়ে দেয়া নয়। শরিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। সেজন্য শরিয়াকে নারী, শিশু ও সকলের অধিকার, তাদের শিক্ষা, বাসস্থান, চাকরী, দারিদ্র মুক্তি ও ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধার দিকেও খেয়াল করতে হবে। তার কাছে শরিয়া কোন নিয়ন্ত্রিত আইনের একগুচ্ছ কাঠামো নয়। এটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির একটা মেনিফেস্টো ।

    শরিয়ার মাকাসিদ নিয়ে যুগে যুগে ইসলামী শাস্ত্রজ্ঞরা প্রচুর কাজ করেছেন এবং সেই মাকাসিদকে যুগোপযোগীতার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও করেছেন। তারিকের ব্যাখ্যার মধ্যে যেমন চমৎকারিত্ব আছে, আধুনিকতা আছে, তেমনি যুগোপযোগীতার ভাবনাটাও জ্বলজ্বল করছে।  আজকের দিনের প্রেক্ষিতে তারিকের যুক্তি মোটেও উপেক্ষনীয় নয়।  বিশেষ করে অক্ষরবাদীদের আইনী ব্যাখ্যার পাশে তারিকের যুক্তি আমাদেরকে নতুন ভাবনার জগতে নিয়ে যায় বৈকি।  বরং তার যুক্তির মধ্যে ইমাম গাজ্জালীর চিন্তার কতকটা সাদৃশ্য আছে বলে মনে হয়।  ইমাম গাজ্জালী শরিয়াকে মানবকল্যানমুখী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।  একই সাথে কুরআন-হাদীসের নীতির প্রতি অনুগত থেকে কিভাবে ইসলামী আইনকে অধিকতর ইনসাফভিত্তিক ও মানববাদী হিসেবে উপস্থাপন করা যায় সেটাই ছিল তার লক্ষ্য।  সম্ভবত: তারিকের উদ্দেশ্যও একই রকম।  তবে ইমাম গাজ্জালী কর্তৃক আরোপিত মাকাসিদের সীমানা তারিক কোন কোন ক্ষেত্রে অতিক্রম করেছেন বলে মনে হয়।

    তারিকের আরেকটি প্রস্তাবনা হচ্ছে আধুনিক কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত বিপুল প্রসার ঘটে গেছে যে একজনের পক্ষে তা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়।  তাছাড়া আজকের দিনের জীবন ও সমাজ বাস্তবতাও  এত জটিল হয়ে উঠেছে যে কোন একটা বিশেষ জ্ঞান দিয়ে তা মোকাবিলা করা যাবে না। মুফতি বা ফকিহরা ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী হলেও অনেক বিশেষায়িত জ্ঞানের উপর তাদের দখল নেই।  সুতরাং এসব বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সম্বন্ধে তারা কিভাবে মতামত দেবে? এক্ষেত্রে তারিকের মত হচ্ছে ফকীহদের সাথে আইন প্রণয়নের সময় বা আইন সম্পর্কে মতামত দেয়ার সময় এসব বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করতে হবে।

    তারিকের অনেক সমালোচক মনে করেন তিনি ইসলামকে ‘আধুনিক’ করার চেষ্টা করছেন।  কিন্তু তারিকের মত হচ্ছে –না ।  তিনি মনে করেনঃ

    As can be seen, I am far from wishing to ‘Islamize Modernity’ and my objective is much more transparent and coherent – although it is particularly difficult since it is to give ourselves the means to remain faithful to a religious tradition at the heart of the modern era while opening a dialogue about values and purposes, whether specific or universal, shared between civilizations.১৮

    রেডিকাল রিফরম বইতে তারিক তার প্রস্তাবিত Applied Islamic Ethics এর কতকগুলো কেস স্টাডি দিয়েছেন। এখানে চিকিৎসা বিজ্ঞান, নারী, অর্থনীতি ও পরিবেশ, শিল্প ও সংস্কৃতি, সমাজ, শিক্ষা ও ক্ষমতা সম্পর্কে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গির উম্মোচন করেছেন যা একই সঙ্গে যুগোপযোগী ও ইসলামী ভাবের সাথে সম্পর্কিত।

    বর্তমানে বহুল আলোচিত ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন এটি প্রচলিত বাজার অর্থনীতির ছকের মধ্যে থেকে কাজ করছে। ছক ভাঙ্গা তাই এদের লক্ষ্য হতে পারেনি। তার ভাষায়ঃ

    The perversion goes even deeper and is particularly dangerous: this “Islamic economy”, along with its sister “Islamic finance”, suggest a series of reforms of the techniques and modalities of transactions at the heart of the classical system, which they do not question in its essence, but which on the contrary they confirm both in its philosophy of productivist profitability and in its global domination. Presented in this way, the great catchphrase “an Islamic economy” is far from being an alternative. At best it is simply a “marginal option” whose function is insensibly to confirm the preeminence of the “mainstream” – that is to say, the liberal market economy.19

    ইসলামী অর্থনীতি প্রসঙ্গে তারিকের কথা হলো বর্তমানে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইনান্স কতকগুলো পরিভাষা ও কৌশল পরিবর্তন করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতই লাভালাভের হিসাব কিতাবে ব্যস্ত।  এটি পুঁজিবাদী ছকের ভিতরে থেকেই কাজ করছে। কিন্তু এটি পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করতে পারেনি। ইসলামী অর্থনীতির মাকাসিদ হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি, পুঁজি ও সম্পদের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতি, কর জালিয়াতির মত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা । বিনিয়োগের লক্ষ্য যেন নির্বিচার ভোগবাদিতাকে উস্কে না দেয় বরং জনগনের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, চাকরী ও দারিদ্রমুক্তিও যেন বিনিয়োগকারীর লক্ষ্যচ্যুত না হয়। তারিক মনে করেন অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক মুক্তি হবে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাজনৈতিক সুবিচারও পাওয়া যাবে না।

    নারী সম্পর্কে তার কথা হচ্ছে ইসলামের বাণীকে এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অবরুদ্ধ, বিচ্যুত ও বিকৃত করা হয়েছে এবং ইসলামী আইনও অনুকরণ ও প্রত্যাখ্যানের টানাটানিতে পড়ে গেছে। নারীদেরকে তাই এগিয়ে আসতে হবে এবং ইসলামী আইন তাদের ক্ষেত্রে যাতে ইনসাফের সাথে প্রয়োগ করা হয় সেজন্য নারীদেরকেও ইসলামী আইনের ফলোপযোগী বিকাশে এগিয়ে আসতে হবে। তারিকের ভাষায়ঃ

    Women should not wait passively for something to happen: they must look after themselves and develop new approaches in the light of higher objectives to protect their being, their integrity, their femininity and their rights.20

    সংস্কৃতি সম্পর্কে তারিকের কথা হলোঃ

    They should strive to give birth to professional, appealing, new, universal productions, avoiding the two dangers that seem to threaten Muslims: on the one hand, imitating popular culture while “Islamizing” products of Americanization or westernization of cultures, and on the other hand, confining themselves to Islamic productions that reduce artistic  and aesthetic substance to the mere repitition of appropriate affective and behavioral “norms” that ultimately only address those who are already convinced.21

    শুধু তাই নয় তারিক সর্বপ্রকার হুদুদ আইনের (Islamic Penal Code) উপর এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা (Moratorium) আরোপের কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মৃত্যুদণ্ড ও পাথর মেরে হত্যার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।  ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট সারকোজির সাথে এক টিভি বিতর্ককালেও তিনি ঐ মোরাটরিয়ামের কথা বলেছিলেন। তার কথা হচ্ছে অনেক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হুদুদ আইনের ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে।  এতে একদিকে রাজা-বাদশাহ এবং সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা বিচারের উর্ধ্বে রয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিশেষ করে গরীব ও নারী সমাজ এর ভিকটিম হচ্ছে। তারিক বলতে চান Implement justice, not punishment.

    কিন্তু কথা হচ্ছে যে কোনো আইনের অপব্যবহার হতে পারে।  তার মানে এই নয়  মাথা ব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলা। সেক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার রুখতে হবে। অন্যদিকে তারিকের এসব কথার তাৎপর্য যথেষ্ট মূল্যবান হলেও কুরআন শরীফের নির্ধারিত ব্যবস্থাকে স্থগিত করতে চাওয়া বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদরা কিভাবে নেবেন বা এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্যের প্রয়োজন আছে কিনা সেগুলো জরুরি প্রশ্ন। তাছাড়া পশ্চিমের কাছে ইসলামকে মানানসই করে তোলার চেয়ে মুসলমানদেরই উচিত হুদুদ আইন সম্পর্কে অন্যের চাপে নয়, নিজেদের প্রয়োজনে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়া যা হবে গ্রহণযোগ্য, বাস্তবায়নযোগ্য, একই সাথে কালোপযোগী। কোনো সন্দেহ নেই, ‘রেডিকাল রিফর্ম’ তারিক রামাদানের একটি ইজতেহাদী বই যা সৃজনশীল পাঠকের চিন্তায় বড় রকমের ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা এ কালে ইসলামের পুনর্মূল্যায়ন করতে চান,  আবার একই সাথে ইসলামকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার বিকল্প বয়ান তৈরি করতে চান তাদের কাছে এ বই ভাবনার খোরাক যোগাবে।

    ছয়.

    তারিক রামাদান ইউরোপে বসে তার মুসলিম পরিচয় টিকিয়ে রাখার কথা বলেছেন। কিন্তু পাশাপাশি এই মুসলিম পরিচয়ের বাইরে তিনি যে একজন মানুষ, মানুষ হিসেবেও তার একটি অবস্থান আছে এটিও তিনি বিস্মৃত হননি। স্যামুয়েল হান্টিংটন পশ্চিমে বসে তার স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন তার বিখ্যাত সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব। সেই তত্ত্বের ফলাফল আমরা এখন হাতেনাতে পাচ্ছি। বিশ্বজুড়ে হানাহানি, লুটমার, রক্তক্ষয়, মানবিক বিপর্যয় এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

    এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ছবির পাশে বসে তারিক রামাদান ভিন্ন একটি ছবি আকার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই ছবি বহুত্বের, সম্প্রীতির, বন্ধনের।  তারিক বলতে চান বিশ্বজুড়ে নানামত, ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রবাহ আছে, থাকবে। এর  মধ্যেও খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদী, মুসলিম, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সকলে ভাগাভাগি করার মতো একটি সাধারণ যায়গা আছে। এই সাধারণ জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা কি কোনো ঐক্য বা সম্প্রীতির ভাবনায় উজ্জ্বীবিত হতে পারি না? তারিকের এই বিশ্বাসের স্ফুরণ ঘটেছে তার বই The Quest for Meaning: Developing a Philosophy of Pluralism এ।

    এ বইটিতে তিনি একটি Planetary Ethics -বৈশ্বিক নৈতিকতার কথা বলেছেন। এ নৈতিকতা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সারা পৃথিবীর সব মানুষের এজমালী ও সাধারণ সম্পত্তি। তারিকের কথা হচ্ছে এই বৈশ্বিক নৈতিকতাকে ভিত্তি করে সারা পৃথিবীর মানুষ বহুত্ব ও সহাবস্থানের একটি পরিবেশ খুঁজে পাবে। তিনি লিখেছেন:

    The notions of equality, freedom, humanity, emotion and memories belong, for instance, to all traditions and all philosphies, but their absolute truth is in no one’s posession. And, as we shall demonstrate, the universal can only be a universal that is shared.22

    বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব বা সভ্যতার সংলাপ কথাটা আমরা কূটনৈতিক ভাষায় বা রাজনৈতিক কৌশলের কারণে যতখানি বলি, কার্যকর অর্থে আজকের বিশ্ব ব্যবস্থা সেটি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এটি না পারার কারণ হচ্ছে সভ্যতায় সভ্যতায় অবিশ্বাস, জাতিতে জাতিতে বিসম্বাদ এবং পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করার নীতি। সভ্যতার ইতিহাস ধরেই অনেকটা এভাবেই চলছে। বিভিন্ন সময় পণ্ডিত, দার্শণিক ও শিল্পীরা তাত্ত্বিকভাবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করলেও এবং স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে তা মানুষের মনকে নাড়া দিলেও কার্যকর কিছু এখনও মানুষের অধরা রয়ে গেছে। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। এর মধ্যেও সভ্যতা-সভ্যতায় আদান-প্রদান হয়, ভাব বিনিময় হয়। তারিকও স্বপ্ন দেখেছেন এবং এ সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেনঃ

    My philosophy is travel, and pluralism is my destination. Humility is my table, respect is my garment, empathy is my food and curiosity is my drink. As for love, it has a thousand names and is by my side at every window.23

    সাত.

    তারিক রামাদান পুরোপুরি উত্তর আধুনিক যুগের সন্তান, যে যুগের ভাষা, প্রতীক, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি চিন্তা তার মাতামহ হাসান আল বান্নার থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন প্রকৃতির।  হাসান আল বান্না ও তার ভাবশিষ্য সাইয়েদ কুতুবও ইসলামের মধ্যে এক ধরণের সংস্কার চেয়েছিলেন।  তারা আধুনিককালে বিশুদ্ধ ইসলামের ধারণা ফিরিয়ে এনেছিলেন।  কিন্তু তারা ঠিক সপ্তম শতাব্দীর ইসলামকে  ফিরিয়ে আনতে চাননি।  তারা বিশ্বাস করতেন বিস্তারের দিক দিয়ে কুরআনের বাণী আধুনিকতার চেয়ে বিশাল এবং এর পক্ষে আধুনিকতাকে আত্মস্থ করা সম্ভব।  তাই তারা সপ্তম শতাব্দীর ইসলামকে ফিরিয়ে না এনে আধুনিক পৃথিবীকে ইসলামী রসে পুনর্গঠন করতে চাইলেন।  ইসলামী তাৎপর্যের ভিত্তিতে আধুনিক জীবনের সব উপকরণ তারা পূর্ণ করার কথা বললেন। এই জন্য তারা আধুনিক জীবনের সাপেক্ষে কুরআনকে নতুন করে পড়লেন এবং এর নতুন ব্যাখ্যায় ব্রতী হলেন। ঐতিহ্যবাহী আলেমদের সাথে বান্না ও কুতুবের তফাতের প্রধান জায়গাটা হচ্ছে এখানে।  তারা মনে করেছিলেন এই সংস্কার কার্য শেষ করতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা করায়ত্ত করা চাই এবং এর পথে প্রধান বাধা হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যা কিনা মুসলিম মানসে এক ধরণের উপনিবেশীকরণের জন্য দায়ী। এর জন্য তারা তাদের কালে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতা আজ পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। একেই আজকে বলা হচ্ছে Political Islam- রাজনৈতিক ইসলাম।

    এই রাজনৈতিক ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়া এবং এই রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়াকে কুতুবের ভাষায় অনেকে বলেছেন ইসলামী বিপ্লব।  রামাদান পশ্চিমের বিপদকে মাতামহের মতোই বুঝতে পারেন। তিনি একে বলেছেন a Western aggressive culture invasion । কিন্তু তিনি কখনো ইসলামী রাষ্ট্র বা বিপ্লবের কথা বলেননি। উল্টো পশ্চিমা জাতিরাষ্ট্রের আওতায় মুসলমানদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার ভাষায় ল্যাটিন আমেরিকার লিবারেশন থিয়লজিস্টদের ঘ্রান পাওয়া যায় অথবা তিনি কখনো কখনো বিশ্বায়ন বিরোধীদের (Anti-globalist)  মত করে কথা বলেন। আবার কখনো কখনো তাকে উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীর মত লাগে যিনি একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছেন মাত্র। পশ্চিমে অনেকে তাকে মুসলিম মার্টিন লুথারও বলে থাকেন।  তবে যাই হোক তারিকের পথ ঠিক বান্না বা কুতুবের মত নয়। সেটা সম্ভবও নয়। কারণ দু’জনের সময় ও প্রেক্ষাপট এক নয়। তারিক রাজনৈতিক ইসলামকে ইসলামিজম বলে থাকেন।  তার কাছে এটি এক ধরনের অতি রাজনীতিকরণে দুষ্ট হয়ে গেছে।  তিনি লিখেছেনঃ

    এখন উচিত আমাদের অগ্রাধিকার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণ করা, গতিপথ পুনঃনির্ধারণ করা। এখন উচিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থার অতি রাজনীতিকরণ বন্ধ করা। শতাব্দী ব্যাপী রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা করে এবং বিগত কয়েক দশক ক্ষমতা নিজে ব্যবহার করে ইসলামিজম বর্তমানে একটি মধ্যপন্থা ও ব্যবস্থাপনার আদর্শতে পরিণত হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীলভাবে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরোধিতা কিংবা নিজেদের মধ্যে শত্রু তৈরি করা ছাড়া বৃহত্তর পরিসরে উপহার দেয়ার মতো এখানে আর কিছু নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো যতদিন এরূপ নিয়ন্ত্রণ প্রবণ ও প্রতিক্রিয়াশীল ভিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন তারা নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না।২৪

    তিনি মনে করেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামী রাজনীতির চেয়ে রাজনীতিতে ইসলামী নীতি, আদর্শ অর্থাৎ ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, জওয়াবদিহিতা সহ কার্যকর দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। তিনি বলতে চান ইসলামী সমাজ একটি কল্যাণকামী সমাজ এবং কোনোভাবেই সেটা পুলিশী সমাজ নয়। রসূল (স.) সমাজে ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং জুলুমের বিরুদ্ধে খুবই স্পর্শকাতর, যত্নশীল ও সোচ্চার ছিলেন।  রাজনৈতিক ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ে তারিকের চিন্তাভাবনা কিছুটা পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রভাবিত বলেই মনে হয়। ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা তার কাছে ইসলামী নৈতিকতার বিপরীত ও বিপজ্জনক বলে প্রতীয়মান হয়।  রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তিনি এক ধরণের নৈতিকতা চর্চার কথা বলেন কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের উপর  ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা ছড়ি ঘুরাক এটা তিনি চাননা।২৫  স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, বহুত্ব, বাকস্বাধীনতা, জওয়াবদিহিতা, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্নীতিমুক্তি প্রভৃতিকে তিনি রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও একই সাথে নৈতিকতা বলে মনে করেন এবং তার মতে এই সব পশ্চিমের মৌলিক মুল্যবোধ গুলো ইসলামের মৌলবিশ্বাসের পরিপন্থি নয় মোটেই।  ধারণা হিসেবে এই পশ্চিমা মুল্যবোধ গুলো সম্পর্কে ইসলামের নিজস্ব বিবেচনা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এ গুলো অবশ্যই ইসলামী নীতির বিপক্ষ নয়। তবে ইসলামের দিক দিয়ে এসবের একটা যুৎসই বিকল্পও আছে। সম্ভবতঃ তারিক রামাদান এগুলো ভেবে দেখেননি।

    এভাবে পশ্চিমের মূল্যবোধগুলো হুবহু ইসলামের কাঠামোর মধ্যে তালুবন্দী করতে গেলে সমস্যা হচ্ছে উভয়ের মূল্যবোধগুলোকে নির্বিশেষ করে ফেলা হয় এবং উভয়ের বৈসাদৃশ্যের বদলে সাদৃশ্যটাই বড় হয়ে দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যাপারটা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সংস্কৃতির একটা অর্থ করা হয় আত্মপরিচয় যার মধ্যে স্বাতন্ত্র্যের ব্যাপারটা থাকবে। যদি স্বাতন্ত্র্যই না থাকে, তাহলে পৃথক পরিচয় অক্ষুন্ন রাখাটাও কঠিন। এমতাবস্থায় ইসলামী জগতের উপর পাশ্চাত্যেও আধিপত্যের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে।

    তারিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার ধারণাকে গ্রহণ করেন না।  তিনি ইসলাম বনাম পশ্চিম এই বিভাজনও স্বীকার করেন না।  এমনকি ইসলাম বনাম সেকুলারিজমের ধারণাও তার কাছে গ্রহনীয় নয়।  যে যুগ সমাগত তারিক মনে করেন সেখানে সভ্যতা সভ্যতায় সংলাপ,  খোলা দরজা দরকার।  সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা থেকে মুসলমান সমাজকে তাই বেরিয়ে আসতে হবে।  শুধু শুধু নিজেদের দুর্গতির জন্য পশ্চিমকে দায়ী না করে এবং পশ্চিমের বস্তুগত ঐস্বর্যের ফাঁদে না পড়ে নিজ সমাজের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য সচেষ্ট হওয়া বেশি প্রয়োজন।  তাহলেই মুসলিম সমাজ পশ্চিমের অভিঘাতকে মোকাবিলা করতে পারবে।  কিন্তু কথা হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার ধারণা কিংবা ইসলাম বনাম পশ্চিমের সাংস্কৃতিক বিভাজনের ধারণা তৈরি হয়েছে ক্ষমতা ও শক্তির সম্পর্কের ভিতর দিয়ে।  যত সহজে বহুত্ববাদী পৃথিবী,  সভ্যতা-সংস্কৃতি-ধর্মের বহুত্ব ও সহাবস্থান এবং সমতা ও শান্তির কথা বলা যায় বাস্তবতা ঠিক সেরকম নয়।  পশ্চিমের সাথে ইসলামের বা পশ্চিমের লেজুড় সেকুলারিস্টদের সাথে ইসলামপন্থীদের পারস্পরিক অবস্থান পুরোপুরি ক্ষমতার সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং অর্থনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মুসলিম জগতকে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরশীল করে রাখাই পশ্চিমের উদ্দেশ্য।  এই বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে বহুত্ববাদী পৃথিবী প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।  এটা তারিকের অজানা থাকার কথা নয়। বহুত্ববাদী পৃথিবী প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার ক্ষমতার সম্পর্কের ভিতরে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।

    তারিকের মূল্যায়নের গুরুত্ব মেনে নিয়েই বলতে হয় সবাই তার এসব কথার সাথে সহমত হবেন এমন নয়। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে রাজনৈতিক ইসলামের একটা ইতিহাস আছে। ঔপনিবেশিক শক্তির সামনে আত্মপরিচয়ের আকাঙ্খা থেকে যে উদ্বেগ- তার থেকে রাজনৈতিক ইসলামের বিকাশ।  সেই উদ্বেগ আজও কাটেনি। বরং নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের ত্রাসনীতি সেটি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেদিক দিয়ে রাজনৈতিক ইসলামের প্রাসাংগিকতা হারায়নি। আর তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা মুসলিম মনন থেকে কখনোই হারিয়ে যায়নি। রাসূল (সা.) কেও ইনসাফের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকেই এগুতে হয়েছিল। রাজনৈতিক ইসলামের ত্রুটিগুলোকে সংশোধন করা যেতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক ইসলাম প্রাসংগিকতা হারিয়েছে সেটা সঠিক নয় মোটেই। তারিক রামাদান হয়তো তার ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটের কারণে রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে সংকোচ বোধ করেছেন। তারপরও বলতে হবে তারিক রামাদান একজন সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবী। তার বুদ্ধিজীবীতা একালের ইসলামের চিন্তাজগতে বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে।  ইসলামী ভাবনার জগতেও ভিন্নমত ভিন্নস্বর আছে। এটা যে কোনো সভ্যতার সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ। তারিক রামাদান এই সৃষ্টিশীলতার প্রতীক।

    গ্রন্থঋণঃ

    ১. Paul Berman, Who’s Afraid of Tariq Ramadan?: The Islamist, the Journalist and the defense of liberalism. Washington: The New Republic, June 4, 2007.

    2. Ibid.

    ৩. আবু এন এম ওয়াহিদ, তারিক রামাদান ও তার চিন্তাধারা। দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৮ আগস্ট, ২০১২।

    ৪. Tariq Ramadan, What I Believe. Oxford: OxfordUniversity Press, 2010.

    ৫. Tariq Ramadan, An Open Letter to My Detractors in the Netherlands.

    ৬. Tariq Ramadan, What I Believe.

    ৭. Paul Berman, Who’s Afraid of Tariq Ramadan?

    ৮. Ibid.

    ৯. Tariq Ramadan, In the Footsteps of the Prophet: Lessons from the Life of Muhammad. Oxford: OxfordUniversity Press, 2007.

    ১০. Ian Buruma, Tariq Ramadan Has an Identity Issue. New York Times, February 4, 2007.

    ১১. Tariq Ramadan, What I Believe.

    ১২. তারিক রামাদান অনুবাদ, এম রুহুল আমিন, মুসলিমের ইউরোপ: ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে ইসলামী সূত্র সমূহের ওপর একটি গবেষণাকর্ম। ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, ২০০৮।

    ১৩. Tariq Ramadan, Western Muslims and The Future of Islam. Oxford: OxfordUniversity Press, 2005.

    ১৪. Tariq Ramadan, Islam, The West and the Challenges of Modernity. Leicester, The Islamic Foundation, 2009.

    ১৫. Ibid.

    ১৬. Ibid.

    ১৭. Radical Reform: Islamic Ethics and Liberation. Oxford: OxfordUniversity Press, 2009.

    ১৮. Ibid.

    ১৯. Ibid.

    ২০. Ibid.

    ২১. Ibid.

    ২২. Tariq Ramadan, The Quest for Meaning: Developing a Philosophy of Pluralism. London: Penguin Books, 2012.

    ২৩. Ibid.

    ২৪.  তারিক রামাদান অনুবাদ, আবু সুলাইমান, বিয়ন্ড ইসলামিজম। দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৮ আগস্ট ও ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩।

    ২৫. Tariq Ramadan, Islam and the Arab Awakening. Oxford: OxfordUniversity Press, 2012.

            তথ্যসূত্রঃ  http://imbdblog.com

    ____________________________________________________

    তারিক রামাদান জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ করেছেন দর্শন এবং ফরাসি সাহিত্যে; ডক্টরেট করেছেন অ্যারাবিক এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ এ ইউনিভার্সিটি অফ জেনেভা থেকে। তিনি দীর্ঘদিন সুইজারল্যান্ডের ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ ও দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। তারিক রামাদান কায়রোর আল আজহার ইউনিভার্সিটির স্কলারদের কাছ থেকে ক্লাসিক ইসলামিক স্কলারশিপে ওয়ান-অন-ওয়ান ইনটেনসিভ ট্রেনিং নিয়েছেন।তারিক রামাদান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কনটেমপোরারি ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক (ওরিয়েন্টাল ইন্সটিটিউট, সেন্ট এন্টনি কলেজ)। সেই সাথে তিনি অক্সফোর্ডের ফ্যাকাল্টি অফ থিওলজিতে শিক্ষাদান করেন। একইসাথে তিনি কাতার (ফ্যাকাল্টি অফ ইসলামিক স্টাডিজ) এবং মরোক্কো (মুন্দিয়াপোলিস) তে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দ্বায়িত্বপালন করছেন। সেই সাথে জাপানের কিয়োটোর দোশিশা ইউনিভার্সিটিতে তিনি সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন।প্রফেসর তারিক রামাদান বর্তমানে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের ইউরোপিয়ান থিঙ্ক ট্যাংক — ইউরোপিয়ান মুসলিম নেটওয়ার্ক (ইএমএন) এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্তব্য পালন করছেন।উল্লেখ্য, তিনি মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সালে ক্লাসিক্স ডিপার্টমেন্টের ইসলামিক স্টাডিজ এর অধ্যাপক পদ এবং রিলিজিয়ন, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড পিস-বিল্ডিং এ হেনরি আর লিউস প্রফেসর পদ অধিকার করেন। বুশ নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন তার ভিসা প্রত্যাহার করলে তিনি এই দু’টো পদ প্রত্যাহার করেন। ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর তার উপর এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আমেরিকা।তিনি ২০টি’র অধিক বই ও ৭০০টির অধিক প্রবন্ধের লেখক বা সহ লেখক। বিশ্বের ইসলামি পুনর্জাগরণে বিশেষ করে পাশ্চাত্য ও সমকালীন বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কিত তর্ক-বিতর্কে লেখা এবং বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, রাখছেন। তিনি একাডেমিক লেকচার ছাড়াও বিশ্বজুড়ে তৃণমূল পর্যায়েও বক্তৃতাদান করে থাকেন। তার আলোচনার বিষয়ে থিওলোজি, ইসলামিক আইন এবং বিচার, অ্যাপ্লাইড এথিকস, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইন্টারফেইথ এবং ইন্ট্রাকমিউনিটি ডায়ালোগ।২০০৪ সালের এপ্রিল মাসের টাইম ম্যাগাজিনের জরীপে বিশ্বের ১০০জন বিজ্ঞানী এবং থিঙ্কারের তালিকায় তারিক রামাদান রয়েছেন। ২০০৯ সালে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের অনলাইন ভোটে তারিক রামাদান সমসাময়িক ১০০ জন সেরা ইন্টেলেকচুয়াল তালিকায় ৪৯তম অবস্থান পেয়েছিলেন।
    পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল, দার্শনিক, টাইম ম্যাগাজিন এর জরিপে পৃথিবীর ১০০ জন সেরা চিন্তাবিদের একজন ।তারিক রামাদানের কিছু :

    “আধ্যাত্মিকতা অর্জনের ব্যাপারটাই হলো নিজের নফসের সাথে ক্রমাগত জিহাদ করা।”
    – তারিক রামাদান

    “আমি যতই জ্ঞান অর্জন করি, আমার বিশ্বাস ততই দৃঢ় হয়। আমি যতই শিখি, আমি ততই সুন্দর করে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারি। কারণ, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত জ্ঞানের মহাজ্ঞানী আল্লাহ। আমি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে যা করতে চাই তা হলো — তাঁর কাছে যাওয়া”
    – তারিক রামাদান

    “আপনি আজকে যা করছেন তা হয়ত আমি পছন্দ করিনা, কিন্তু তাই বলে আমি আপনাকে ছোট করবো না। কারণ, আগামীকালের আপনি আপনি হয়ত আজকের আমার চাইতে ভালো হবেন”।
    – তারিক রামাদান

    প্রবচনগুচ্ছ

    “নিজেকে যতই গভীর করে লক্ষ্য করবেন এবং বুঝতে পারবেন, আপনি অন্যদের প্রতি ততই কম বিচারপ্রবণ হবেন।”— তারিক রামাদান

    উত্তম চরিত্র সব সময় একটি প্রশ্ন দ্বারা শুরু হয়, “আমি কেন এটা করছি?”– তারিক রামাদান

    “ধর্ম ছাড়া কোন সংস্কৃতি নেই, সংস্কৃতি ছাড়া কোন ধর্ম নেই, কিন্তু ধর্ম কোন সংস্কৃতি নয়”-তারিক রমাদান

    “আরবি ভাষা হচ্ছে মহিমান্বিত কুরআনের ভাষা, কিন্তু আরব সংস্কৃতি ইসলামের সংস্কৃতি নয়।”– তারিক রামাদান

    “আপনি যদি খুব ভালো একটা জীবন পেতে চান, কখনো ভুলবেন না যে আপনি একদিন মরে যাবেন।” — তারিক রামাদান

    “আধ্যাত্মিকতা অর্জনের ব্যাপারটাই হলো নিজের নফসের সাথে ক্রমাগত জিহাদ করা।” – তারিক রামাদান

    “আমি যতই জ্ঞান অর্জন করি, আমার বিশ্বাস ততই দৃঢ় হয়। আমি যতই শিখি, আমি ততই সুন্দর করে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারি। কারণ, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত জ্ঞানের মহাজ্ঞানী আল্লাহ। আমি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে যা করতে চাই তা হলো — তাঁর কাছে যাওয়া”– তারিক রামাদান
    [যুক্তরাস্ট্রের জয়তুনা কলেজে আমন্ত্রিত বক্তার বক্তব্যে একথা বলেন]

    “আপনি আজকে যা করছেন তা হয়ত আমি পছন্দ করিনা, কিন্তু তাই বলে আমি আপনাকে ছোট করবো না। কারণ, আগামীকালের আপনি আপনি হয়ত আজকের আমার চাইতে ভালো হবেন”।-– তারিক রামাদান

    “একটা কথা প্রচলিত আছে, যা রটে তার কিছু তো বটে। এটি একটি বাস্তব সত্য। কিন্তু একজনের খুঁজে দেখা উচিত যে রটনার ঘটনাটাতে কী ঘটেছে এবং কে সেটা ঘটিয়েছে।”-– তারিক রামাদান
    [লেখক তার ‘What I believe’ গ্রন্থে লিখেছেন]

    “অনেকে বলে থাকেন, আমি কোন রাজনীতি করিনা, রাজনীতি পছন্দ করিনা। প্রকৃতপক্ষে, কোন রাজনীতি না করাও অন্য একটা রাজনীতির অংশ।”– তারিক রমাদান

    “প্রত্যেক মহান ব্যক্তির অন্তরালে একজন নারী থাকে না।সে থাকে তার সাথে, সে থাকে তার পাশে, কিন্তু তার পিছনে নয়।” – তারিক রামাদান

    “ইসলাম আছে আমার অন্তরের ভিতর’ — এই কথাটা বলা আর পরীক্ষার হলে সাদা খাতা জমা দিয়ে “জ্ঞান আছে আমার মস্তিষ্কে” বলা একই কথা “।– তারিক রামাদান

    “ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম। সুতরাং, জেগে উঠুন এবং নামাজে দাঁড়িয়ে যান। এর মাধ্যমে আপনি আপনার ইগো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবেন”।– তারিক রামাদান

    “ইসলামে কোন সংস্কারের প্রয়োজন নেই। সংস্কার প্রয়োজন আমাদের মুসলিমদের মানসিকতায়”।– তারিক রামাদান

    “আপনার জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলোর ব্যাপারে কী করছেন তা আমাকে বলুন, আমি বলে দিতে পারবো আপনি কে”।– তারিক রামাদান

    “মুসলিম হিসেবে গর্বিত হওয়াটা কোন স্ট্যাম্প নয় যেটা আপনার বুকের উপরে লাগানো থাকে, বরং এটি এমন একটি আলো যা আপনার অন্তরকে আলোকিত করে রাখে।”–তারিক রামাদান

    “মুক্তি কী তা আপনি বুঝতে পারবেন না যদি শৃংখলা কী তা বুঝতে না পারেন”।–তারিক রামাদান

    “অনেকে আমাকে এসে জটিলতায় ফেলতে চেয়ে প্রশ্ন করেন, “কোনটি আপনার প্রথম পরিচিতি? আপনি কি সুইস নাকি মুসলিম?
    আমি উত্তরে বলি,”ফালতু প্রশ্ন”। যখন আমি ভোট দিই, তখন সুইস নাগরিক হিসেবে ভোট দেই। যখন আমি মারা যাবো, তখন আমার পরিচয় হবে আমি মুসলিম। কেননা আমি পাসপোর্ট দেখিয়ে মৃত্যুকে বরণ করতে যাবো না। আমার মৃত্যু হবে আমার বিশ্বাসকে সাথে নিয়ে।
    যখন আমি ভোট দিবো তখন তা কেবলই বিশ্বাসের উপরে নির্ভর করবে না, আমার বিশ্বাস আমাকে ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশনা দিবে ঠিকই, কিন্তু আমি ভোট দিবো আমার নাগরিকত্বের জন্য। আ্মার অবস্থান এবং প্রেক্ষাপটে তার উপর ভিত্তি করে আমার অনেকগুলো পরিচিতি আছে।”
    – তারিক রামাদান

    [ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া টিভি UCTV.COM আয়োজিত burke লেকচারে প্রফেসর রমাদান এই কথা বলেন]

    “যদি কোনো ইসলামপন্থী দল উদারনৈতিক ব্যবস্থা (Neoliberalism) কে গ্রহণ করে নেয় তাহলে, সেই দলের ব্যাপারে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কোনো আপত্তি নেই। পশ্চিমারা গণতন্ত্র নিয়ে আর মোটেই উচ্চবাচ্য করবেনা, তারা ব্যাক্তিস্বাধীনতা নিয়েও কথা বলবেনা, খালি তারা জানতে চায় আপনার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা কেমন- এটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন”।– তারিক রমাদান
    [“Post Islamist Revolutions” নামক লেকচারে এই কথা বলেন]

    “ইসলামের বিশ্বজনীনতা এজন্য নয় যে ইসলাম সবাইকে সমরূপতা (Uniformity) তে নিয়ে যেতে চায়, বরং ইসলাম হচ্ছে বৈচিত্রময় একতা।”– তারিক রামাদান

    “আরেকজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে আপনার মনে রাখা উচিত যে এটা আপনার কাজ নয় এবং তা সঠিকও নয়। এই বিচারের এখতিয়ার কেবলমাত্র আল্লাহর।”– তারিক রামাদান

    “যখন মিডিয়া নীরব থাকে, তখন আমাদেরকেই মিডিয়া হতে হবে।“– তারিক রামাদান

    “আমরা যখন জটিল সমস্যার জন্য সরলীকৃত সমাধান দিতে চাই তখন আমরা সবকিছু হারাই।”– তারিক রামাদান

    “বই পড়ার মধ্যদিয়ে আপনার নিজের মনন এবং বুদ্ধিবৃত্তিকে সম্মান করুন।”– তারিক রামাদান

    “হৃদয় আপনার বিনয়ের কেন্দ্র। মন হতে পারে আপনার দাম্ভিকতার উৎস।”
    — তারিক রামাদান

    “আমরা মানুষকে বলতে চাই ইসলাম কত মহৎ। অথচ আমরা মুসলিম হিসেবে মহৎ নই।”
    — তারিক রামাদান

    “বিনয় হলো একটা বিষয় ভালো করে জানা — আপনি যে কারো কাছ থেকে একটি উত্তর পেতে পারেন, সে শিশু হতে পারে, অন্য কোন ব্যক্তি হতে পারে, এমনকি প্রকৃতির কাছ থেকেও হতে পারে।”
    — তারিক রমাদান

    “সবচেয়ে ভয়াবহ কারাগার হলো সেটি যার শিকগুলো অদৃশ্য।”
    — তারিক রমাদান

    তথ্যসূত্রঃ

    https://alorpothe.wordpress.com/

    ১) তারিক রামাদান ডট কম/বায়োগ্রাফি
    ২) উইকিপিডিয়া/তারিকরামাদান

Lecture of Tareq Ramadan

1.Islamic Legal Philosophy (Yasir Qadhi, Jasser Auda & Tariq Ramadan)

Link- https://www.youtube.com/watch?v=InkPIsyzxNE

2.In The Footsteps of the Prophet: How Muslims should Contribute to the World

 

                    তারিক রামাদান ও তার চিন্তাধারা :: আবু এন এম ওয়াহিদ


তারিক  রামাদান    তার  চিন্তাধারা  ::  আবু  এন  এম  ওয়াহিদ

মুসলিম  দেশগুলোতে  অনেক  বড়  বড়  আলেম  আছেন  যারা  কুরআন-হাদিসে  গভীর  জ্ঞান  রাখেন,  কিন্তু  তাদের  প্রায়  সবাই  বিজ্ঞান-প্রযুক্তি,  রাজনীতি,  অর্থনীতি  ও  কূটনীতির  মারপ্যাঁচে  সমানভাবে  পারদর্শী  নন।  তার  ওপর  বর্তমানকালে  মানুষের  জীবন,  তাদের  আশা-আকাঙ্ক্ষা,  মনস্তত্ত্ব,  কর্মকৌশল  ইত্যাদি  দেড়-দুই  হাজার  বছর  আগের  তুলনায়  অনেক  বেশি  জটিল,  কঠিন  ও  মাল্টিডাইমেনশনাল।  মানুষের  ধর্মীয়  বিশ্বাস,  মূল্যবোধ,  দৃষ্টিভঙ্গি  ও  ধর্মচর্চা,  ক্রমাগত  প্রভাবিত  ও  পরিবর্তিত  হচ্ছে  তাদের  আর্থসামাজিক  ও  রাজনৈতিক  পরিপ্রেতি  এবং  আন্তর্জাতিক  সম্পর্ক  দ্বারা।  এ  বাস্তবতায়  সনাতনী  পদ্ধতিতে  জ্ঞানচর্চার  মাধ্যমে  বর্তমান  পরিপ্রেক্ষিতে  মানবজীবনের  যাবতীয়  জটিল  সমস্যার  সঠিক  সমাধান  দেয়া  সম্ভব  নয়।

এ  দুর্বলতা  কাটিয়ে  উঠে  হাতেগোনা  যে  ক’জন  মুসলিম  চিন্তাবিদ  সাম্প্রতিককালে  সারা  দুনিয়ায়  সাড়া  জাগিয়েছেন,  তাদের  মধ্যে  আমি  অন্তত  পাঁচজনকে  শনাক্ত  করতে  পেরেছি।  এর  মধ্যে  তিনজনই  ইন্তেকাল  করেছেন।  মুহাম্মদ  আসাদ  (১৯০০-১৯৯২),  ফজলুর  রহমান  (১৯১১-১৯৮৮)  ও  ইসমাইল  আল  ফারুকী  (১৯২১-১৯৮৬)।  যে  দু’জন  জীবিত  আছেন  তারা  প্রায়  একই  বয়সী।  তারিক  রামাদান  (১৯৬২-)  এবং  খালেদ  আবু  এল  ফাদল  (১৯৬৩-)।  যদিও  তাদের  কারো  কারো  ব্যাপারে  ট্র্যাডিশনাল  আলেমদের  মধ্যে  ভিন্ন  মত  থাকতে  পারে।  এদের  সবার  জীবনসংগ্রাম  ও  চিন্তাধারার  সাথে  বাংলাদেশের  নতুন  প্রজন্মের  ছেলেমেয়েদের  পরিচয়  থাকা  উচিত।  আর  এ  প্রয়োজন  মেটাতে  আজ  আমি  পাঠকদের  সামনে  তুলে  ধরছি  তারিক  রামাদানের  জীবন  ও  তার  চিন্তাধারা।  তারিক  আন্তর্জাতিক  খ্যাতিসম্পন্ন  একজন  ইসলামি  চিন্তাবিদ,  অধ্যাপক,  লেখক,  গবেষক,  আলোচক,  বিশ্লেষক  ও  উপস্থাপক।  বর্তমানে  তিনি  ইংল্যান্ডের  বিখ্যাত  অক্সফোর্ড  বিশ্ববিদ্যালয়ে  কন্টেম্পোরারি  ইসলামিক  অ্যান্ড  অরিয়েন্টাল  স্টাডিজের  প্রফেসর।

তারিক  রামাদানের  জন্ম  ১৯৬২  সালের  ২৬  আগস্ট,  সুইজারল্যান্ডের  জেনেভায়।  তারিকের  বাবার  নাম  সাঈদ  রামাদান  ও  মায়ের  নাম  ওয়াফা  আল  বান্না।  তারিকের  নানা  ছিলেন  মিসরের  বিখ্যাত  দার্শনিক  ও  অ্যাক্টিভিস্ট  হাসান  আল  বান্না,  যিনি  ১৯২৮  সালে  মুসলিম  ব্রাদারহুড  প্রতিষ্ঠা  করেন।  ৮৪  বছর  পর  সেই  ব্রাদারহুডের  নেতা  মুহাম্মদ  মুরসি  গণতান্ত্রিক  মিসরের  প্রেসিডেন্ট  নির্বাচিত  হয়েছেন।  তারিকের  বাবা  সাঈদ  রামাদান  ব্রাদারহুডের  রাজনীতির  সাথে  প্রত্যভাবে  জড়িত  থাকায়  মিসরের  তৎকালীন  প্রেসিডেন্ট  জামাল  আবদুল  নাসের  তাকে  সুইজারল্যান্ডের  জেনেভায়  নির্বাসনে  পাঠিয়ে  দেন।  সাঈদও  আধুনিক  ও  ইসলামি  জ্ঞানে  সমান  পারদর্শী  ছিলেন।  তার  আরেকটি  পরিচয়  হলো  তিনি  মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রের  বিখ্যাত  সামাজিক  ও  ইসলামি  অ্যাক্টিভিস্ট  ম্যালকম  এক্সের  একজন  মেন্টর  ছিলেন।  ১৯৬৫  সালে  ম্যালকম  হজ  পালন  করে  স্বদেশে  ফিরে  যাওয়ার  পথে  জেনেভায়  কয়েক  দিনের  জন্য  সাঈদ  রামাদানের  আতিথেয়তা  গ্রহণ  করেন।  সেখানে  দীর্ঘ  আলাপ-আলোচনার  পর  সাঈদের  কাছেই  ম্যালকম  প্রথমবারের  মতো  ইসলাম  ও  ইসলামের  শাশ্বত  বাণী  আত্মস্থ  করেন।  পরে  ম্যালকম  তার  শেষ  জীবনে  সাঈদের  কাছে  লেখা  এক  চিঠিতে  এ  কথা  অকপটে  স্বীকার  করেন।

বিদেশের  মাটিতে  জেনেভায়  তারিকের  জন্ম  এবং  সেখানেই  তার  বেড়ে  ওঠা।  তিনি  ইউনিভার্সিটি  অব  জেনেভা  থেকে  আন্ডারগ্র্যাজুয়েট,  মাস্টার্স  ও  পিএইচডি  লাভ  করেন।  তার  স্পেশালিটি  হলো  সমসাময়িককালের  ইসলাম  ও  ইসলামিক  স্টাডিজ।  ইসলাম,  ইসলামের  ইতিহাস  ও  সংস্কৃতির  ওপর  লেখাপড়া  ও  গবেষণার  জন্য  তিনি  কায়রোর  আল  আজহার  বিশ্ববিদ্যালয়ে  কাটিয়েছেন  বেশ  কয়েক  বছর।  সুইজারল্যান্ডের  কলেজ  ডি  সোসুরেতে  শিকতা  দিয়ে  তারিক  শুরু  করেন  তার  পেশাজীবনের  দুর্গম  যাত্রা।  কিছু  দিন  জেনেভায়  চাকরি  করার  পর  ২০০৫  সালে  তিনি  অক্সফোর্ডের  সেন্ট  অ্যান্টোনি  কলেজে  ভিজিটিং  ফেলো  হিসেবে  যোগ  দেন।  ২০০৭  সালে  তিনি  নেদারল্যান্ডের  ইউনিভার্সিটি  অব  লেইডেনে  আসেন  ইসলামিক  স্টাডিজের  প্রফেসর  হয়ে।  অল্প  দিন  পর  লেইডেন  ছেড়ে  তিনি  যোগ  দেন  রটারড্যামের  ইরামুস  ইউনিভার্সিটিতে।  ২০০৯  সালে  তারিক  আবার  ফিরে  যান  অক্সফোর্ডে।  এবার  তাকে  অফার  করা  হয়  সম্মানিত  ‘হামাদ  বিল  খলিফা  আল  সানি’  অ্যান্ডাউড  চেয়ার।  এ  চেয়ার  বিশেষ  করে  সৃষ্টি  করা  হয়েছিল  সমসাময়িক  ইসলামিক  ও  অরিয়েন্টাল  স্টাডিজের  জন্য।

সুইজারল্যান্ডে  থাকতে  তরুণ  বয়সে  তারিক  মুভমেন্ট  অব  সুইস  মুসলিম  নামে  একটি  সংগঠন  গড়ে  তোলেন।  এর  মূল  কাজ  ছিল  দেশের  বিভিন্ন  জায়গায়  ইন্টার  ফেইথ  ডায়ালগের  মাধ্যমে  সুইসদের  মধ্যে  ইসলামের  সঠিক  ও  যুগোপযোগী  বাণী  পৌঁছে  দেয়া।  এসব  ডায়ালগে  তারিক  সরাসরি  অংশ  নিতেন।  ইসলামি  চিন্তার  জগতে  এভাবেই  শুরু  হয়  তারিকের  পরিচিতি।  সাথে  সাথে  তিনি  ইসলাম  ও  অন্যান্য  ধর্ম  বিষয়ে  চালিয়ে  যান  লেখাপড়া  ও  সিরিয়াস  গবেষণা।  পরবর্তী  পর্যায়ে  ইউরোপীয়  ইউনিয়ন  তাকে  নিয়োগ  দেয়  ধর্মবিষয়ক  একজন  উপদেষ্টা  হিসেবে।  এই  সুবাদে  তিনি  ইইউ  কমিশন  অন  ইসলাম  অ্যান্ড  সেকুলারিজমের  মতো  গুরুত্বপূর্ণ  সংস্থাকে  সময়ে  সময়ে  উপদেশ-পরামর্শ  দিয়ে  থাকেন।  ২০০৫  সালে  ব্রিটিশ  সরকার  তাকে  ধর্মীয়  বিষয়ে  একটি  বিশেষ  টাস্কফোর্সে  যোগ  দেয়ার  জন্য  আমন্ত্রণ  জানায়।  তিনি  ব্রাসেলস  বেসড  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ইউরো-মুসলিম  নেটওয়ার্কের  প্রেসিডেন্ট।  তার  দাওয়া  সংক্রান্ত  প্রায়  ১০০  টেপ  বা  সিডি  আছে,  যেগুলো  প্রতি  বছর  দুনিয়াজোড়া  হাজার  হাজার  কপি  বিক্রি  হয়।

একপর্যায়ে  তারিক  মুসলিম  বিশ্বের  স্বৈরাচারী  শাসকদের  বিরুদ্ধে  কঠিন  ও  কঠোর  বক্তব্য  রাখতে  শুরু  করেন।  যার  ফলে  ২০০৯  সালে  তাকে  মিসর,  তিউনিসিয়া,  লিবিয়া,  সিরিয়া  ও  সৌদি  আরবে  অবাঞ্ছিত  ঘোষণা  করা  হয়।  তারিকের  মতো  স্বাধীনচেতা  তেজি  পুরুষ  এসবের  ধার  ধারেন  না।  তিনি  আন্তর্জাতিক  পর্যায়ে  মানবাধিকারের  একজন  বড়  প্রবক্তা।  মানবাধিকার  লঙ্ঘনের  কারণে  মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র,  ইসরাইল  এমনকি  স্বৈরাচারী  মুসলিম  রাষ্ট্রপ্রধানদের  প্রতি  তিনি  কড়া  বক্তব্য  রাখতে  একচুলও  বিচলিত  হন  না।  যার  কারণে  এসব  দেশের  সরকার  ও  রাষ্ট্রব্যবস্থা  তাকে  বিভিন্নভাবে  হয়রানি  করার  চেষ্টা  করে  এবং  এখনো  করছে।  ২০০৪  সালে  আমেরিকার  বিখ্যাত  নটরডেম  বিশ্ববিদ্যালয়  তাকে  লুস  অ্যান্ডাউড  চেয়ার  অফার  করে,  কিন্তু  মার্কিন  ভিসা  না  পাওয়ায়  তিনি  এ  চাকরিতে  যোগ  দিতে  পারেননি।  ২০০৩  সালে  আমেরিকার  ইরাক  যুদ্ধের  বিরোধিতা  করায়  ২০০৪  সালে  বুশ  প্রশাসন  তার  ওপর  ভিসা  অ্যাম্বার্গো  দিয়ে  রাখে।  এ  সরকারি  সিদ্ধান্তের  বিরুদ্ধে  তারিকের  হয়ে  আমেরিকান  সিভিল  লিবার্টিজ  ইউনিয়ন,  আমেরিকান  অ্যাসোসিয়েশন  অব  ইউনিভার্সিটি  প্রফেসারস,  আমেরিকান  অ্যাকাডেমি  অব  রিলিজিওন,  পেন  অমেরিকান  সেন্টার,  ইউসিএলএ  ও  আরো  অনেক  প্রতিষ্ঠান  নিজ  খরচে  আইনি  লড়াই  করে।  অবশেষে  মার্কিন  সরকারের  বিরুদ্ধে  তারই  জয়  হয়।  ২০১০  সালের  ২০  জানুয়ারি  মার্কিন  স্টেট  ডিপার্টমেন্ট  প্রধান  হিলারি  কিনটন  তারিকের  ওপর  থেকে  আমেরিকা  আসার  ভিসা  অ্যাম্বার্গো  তুলে  নিতে  বাধ্য  হন।  সে  বছরই  ৮  এপ্রিল  তিনি  নিউ  ইয়র্কের  কুপার  ইউনিয়ন  গ্রেট  হলে  একটি  গুরুত্বপূর্ণ  প্যানেল  আলোচনায়  অংশ  নেন।

তারিক  রামাদান  মনে  করেন,  পশ্চিমা  বিশ্বে  প্রথম  ও  দ্বিতীয়  প্রজন্মের  মুসলমানেরা  যা  করে  থাকেন  তার  সব  কিছু  ইসলাম  নয়।  তাদের  বেশ  কিছু  কাজকর্ম  আপাতদৃষ্টিতে  ধর্মীয়  মনে  হলেও  আসলে  সেগুলোর  সাথে  ইসলামের  কোনো  সম্পর্ক  নেই।  এগুলো  নিতান্তই  তাদের  আঞ্চলিক  সংস্কৃতি  বা  চালচলনের  অংশ।  তাই  তার  মতে,  বোঝার  সুবিধার  জন্য  ধর্মের  সাথে  সংস্কৃতি  ও  রীতিনীতির  একটি  পার্থক্য  পরিষ্কার  করা  উচিত।  তিনি  আরো  মনে  করেন,  নাগরিকত্ব  ও  নাগরিক  অধিকারের  চর্চা  এবং  ধর্ম  ও  ধর্ম  পালন  এক  নয়।  যেমন  যেকোনো  দেশের  নাগরিক  হিসেবে  মুসলমানদেরও  সে  দেশের  আইন  মেনে  চলার  ওপর  বাধ্যবাধকতা  রয়েছে।  ধর্মের  সাথে  এর  কোনো  সঙ্ঘাত  নেই।  কিন্তু  অনেকে  জ্ঞানের  অভাবে  কৃত্রিমভাবে  এখানে  অযাচিত  একটি  সঙ্ঘাত  সৃষ্টি  করে  সমস্যায়  নতুন  মাত্রা  যোগ  করে  থাকেন।  তারিক  এ  ব্যাপারে  বিদেশে  বসবাসরত  সব  মুসলমানকে  সব  সময়  সজাগ  ও  সাবধান  থাকতে  বলেন।

তারিক  মনে  করেন,  ইউরোপ-আমেরিকায়  বসবাসকারী  মুসলমানদের  উচিত  পাশ্চাত্য  সংস্কৃতির  পরিপ্রেক্ষিতে  কুরআনের  ব্যাখ্যা  করে  সেইমতো  জীবন  যাপন  করতে।  তিনি  সনাতনী  ‘দারুল  ইসলাম’  (অ্যাবোড  অব  পিস)  ও  ‘দারুল  হারব’  (অ্যাবোড  অব  ওয়ার)  বলে  দ্বিপক্ষীয়  বিভাজনকে  গ্রহণ  করেন  না।  তিনি  বলেন,  এ  রকম  কোনো  কিছু  কুরআনে  নেই।  তারিকের  মতে,  এ  দুটোর  মাঝখানে  আরেকটি  অবস্থান  থাকতে  পারে,  যাকে  তিনি  নাম  দিয়েছেন  ‘দারুল  দাওয়া’  (অ্যাবোড  অব  ইনভাইটেশন)।  তিনি  ইউরোপ-আমেরিকার  মুসলমানদের  বৃহত্তর  সমাজ  থেকে  বিচ্ছিন্ন  এবং  আলাদা  না  থেকে  পাশ্চাত্য  সমাজের  সাথে  সম্পৃক্ত  হওয়ার  ওপর  বেশি  জোর  দেন।  তিনি  বলেন,  ইউরোপ-আমেরিকা  দারুল  হারব  নয়,  দারুল  দাওয়াও  নয়;  বরং  এটা  ‘দারুল  শাহাদাহ’  (অ্যাবোড  অব  টেস্টিমনি)।  কারণ  আল্লাহ  পৃথিবীতে  মুসলমানদের  পাঠিয়েছেন  অন্য  সবার  ওপর  সাীস্বরূপ।  তিনি  অভিবাসী  মুসলমানদের  পাশ্চাত্যের  সাথে  একাত্মতার  ওপর  বিশেষভাবে  গুরুত্বারোপ  করে  থাকেন।  মুসলিম  ব্রাদারহুডের  চেয়ে  তিনি  বেশি  গুরুত্ব  দেন  হিউম্যান  ব্রাদারহুডের  ওপর।  এখানে  মুসলমানদের  দায়িত্ব  হওয়া  উচিত  বিদেশী  সরকারের  কাছে  প্রটেকশনের  দাবি  নয়,  বরং  কনট্রিবিউশনের  সুযোগ  চাওয়া।

তারিক  রামাদান  ‘আমরা’  বনাম  ‘তারা’  (উই  ভার্সাস  দে)  ডকট্রিনে  বিশ্বাস  করেন  না।  তার  মতে,  মুসলিম-অমুসলিম  যাই  হোক;  প্রতিবেশী  ও  কমিউনিটির  প্রতি  সঠিকভাবে  নাগরিক  দায়িত্ব  পালনও  ইসলাম  ধর্মেরই  একটি  অংশ।  মুসলমান  সমাজে  স্বৈরাচারী  শাসক  এবং  মুসলিম  দেশে  ন্যায়বিচার  ও  মানবাধিকারের  অভাবের  কারণে  পশ্চিমাদের  মধ্যে  ইসলাম  সম্পর্কে  মারাত্মক  ভুল  ধারণা  রয়েছে।  এ  বিষয়টি  তাকে  খুব  গভীরভাবে  ভাবায়  এবং  তিনি  মনে  করেন  এর  দায়ভার  মুসলমানদেরই  এবং  তাদেরকেই  এটা  ধীরে  ধীরে  কাটিয়ে  উঠতে  হবে।  তারিকের  মতে,  ইউরোপ-আমেরিকায়  মুসলিম  তরুণ  প্রজন্ম  যত  বেশি  সে  দেশের  ভাষায়  ইসলাম  ও  ইসলামের  দর্শনচর্চা  করবে,  গবেষণা  করবে,  লেখালেখি  করবে  তত  তাড়াতাড়ি  মুসলমানেরা  বিদেশের  মাটিতে  তাদের  এ  দুর্বলতা  কাটিয়ে  উঠতে  পারবে।  তারিক  আরো  মনে  করেন,  বিদেশে  বসবাসকারী  মুসলমানেরা  সব  ব্যাপারে  অতিরিক্ত  ডিফেন্সিভ  এবং  তারা  তাদের  ধর্মের  দর্শনকে  অভিবাসী  দেশের  মানুষের  সামনে  সঠিকভাবে  তুলে  ধরতে  পারছেন  না।

তারিক  মনে  করেন,  পশ্চিমাদের  চাপে  নয়,  নিজ  থেকেই  মুসলমানদের  উচিত  সর্বপ্রকার  হুদুদ  আইন  প্রয়োগের  ওপর  আপাতত  মরেটোরিয়াম  অরোপ  করা।  ইতোমধ্যে  ইসলামি  চিন্তাবিদেরা  পরিবেশ,  পরিপ্রেতি  ইত্যাদি  যাচাই-বাছাই  করে  বিষয়টি  নিয়ে  একটি  চূড়ান্ত  সিদ্ধান্তে  আসবেন।  কারণ  হিসেবে  তিনি  বলেন,  অনেক  মুসলমান  সংখ্যাগরিষ্ঠ  দেশে  হুদুদ  আইনের  ব্যাপক  অপপ্রয়োগ  হচ্ছে।  এতে  এক  দিকে  রাজা-বাদশাহ  এবং  সমাজের  প্রভাবশালী  লোকেরা  বিচারের  ঊর্ধ্বে  রয়ে  যাচ্ছে  এবং  অন্য  দিকে  সমাজের  অপোকৃত  দুর্বল  বিশেষ  করে  গরিব  ও  নারীসমাজ  ভিকটিম  হচ্ছে।  তিনি  একটি  কথা  সব  সময়  বলে  থাকেন,  ইমপ্লিমেন্ট  জাস্টিস  নট  পানিশমেন্ট।  মুসলিম  সংখ্যাগরিষ্ঠ  দেশে  তিনি  নিষ্ফল  ইসলামি  রাজনীতির  চেয়ে  রাজনীতিতে  ইসলামী  নীতি-আদর্শ,  অর্থাৎ  ন্যায়বিচার,  মানবাধিকার,  স্বচ্ছতা  ও  জবাবদিহিতাসহ  কার্যকর  দুর্নীতিবিরোধী  অভিযানের  ওপর  বেশি  গুরুত্ব  দিয়ে  থাকেন।  এখানে  তারিকের  সপে  যা  বলা  যায়  তা  হলো,  ইসলামি  সমাজ  একটি  কল্যাণকামী  সমাজ  এবং  কোনোক্রমেই  সেটা  পুলিশি  সমাজ  নয়।  রাসূলুল্লাহ  সা:  সমাজে  ন্যায়বিচার  ও  মানবাধিকার  প্রতিষ্ঠার  পে  এবং  জুলুমের  বিরুদ্ধে  খুবই  স্পর্শকাতর,  যত্নশীল  ও  সোচ্চার  ছিলেন।  পান্তরে  কারো  বিরুদ্ধে  শাস্তি  প্রয়োগের  বেলায়  কখনোই  তিনি  আগবেড়ে  অতি  উৎসাহী  ছিলেন  না।  ইতিহাসে  এ  মর্মে  অনেক  উদাহরণ  আছে।

তারিক  মনে  করেন,  মুসলমানেরা  ইসলামের  ওপর  পোপ  ষোড়শ  বেনেডিক্টের  বক্তব্যে  মাত্রাতিরিক্ত  প্রতিক্রিয়া  দেখিয়েছেন।  তার  মতে,  এটা  করে  মুসলিম  দেশগুলোর  স্বৈরাচারী  শাসকেরা  সাধারণ  নাগরিকদের  ওপর  তাদের  জুলুম,  অনাচার  ও  মানবাধিকার  লঙ্ঘনের  ঘটনা  থেকে  বিশ্ববাসীর  দৃষ্টি  অন্য  দিকে  সরানোর  চেষ্টা  করেছে।  তারিক  আরো  মনে  করেন,  সুইসাইড  বোম্বিং  ও  ভায়োলেন্স  কোনো  যুদ্ধের  কৌশল  হতে  পারে  না;  সে  যে  যুদ্ধই  হোক,  যে  অবস্থাতেই  হোক।  এটা  পরিষ্কারভাবে  ইসলামবিরুদ্ধ  কাজ।  মানুষ  কেন  টেররিজমের  আশ্রয়  নেয়,  তার  মোটিভেশন  বোধগম্য  হলেও  তিনি  কৌশল  হিসেবে  টেররিজম  কিংবা  ভায়োলেন্সকে  ন্যায়সঙ্গত  ও  যুক্তিসঙ্গত  মনে  করেন  না।

তারিক  ২০০৩  সালে  আমেরিকার  ইরাক  আক্রমণের  কঠোর  সমালোচনা  করেছিলেন  এবং  ইরাকিদের  রেজিস্ট্যান্সকে  তিনি  সমর্থন  দিয়েছিলেন;  তবে  সেখানেও  তিনি  সুইসাইড  বোম্বিং  এবং  কোনো  ধরনের  টেররিজমকে  সমর্থন  করেননি।  তিনি  ফ্রান্সে  সেকুলারিজমের  নামে  স্কুলে  এবং  পাবলিক  প্লেসে  ইসলামি  অনুশাসনের  ওপর  ক্রেকডাউনের  ঘোর  বিরোধী।  এ  নিয়ে  ফ্রান্সের  সাবেক  প্রেসিডেন্ট  সারকোজির  সাথে  তার  তর্ক-বিতর্ক  হয়েছে।  ইসরাইলকে  রা  করতে  মানবাধিকারে  ছাড়  দেয়ায়  তিনি  ফরাসি  ইহুদি  বুদ্ধিজীবীদেরও  কঠোর  সমালোচনা  করেছেন।
তারিক  রামাদান  বর্তমান  বিশ্বের  সাতজন  প্রভাবশালী  ধর্মীয়  চিন্তাবিদের  একজন।  ২০০০  সালে  টাইম  ম্যাগাজিন  তাকে  পৃথিবীর  সেরা  ১০০  জন  বুদ্ধিজীবীর  অন্যতম  মনোনীত  করেছে।  ২০০৯  ও  ২০১০  সালে  আমেরিকার  ফরেন  পলিসি  ম্যাগাজিন  তারিককে  পৃথিবীর  সেরা  ১০০  জন  চিন্তাবিদের  মধ্যে  ৪৯তম  স্থান  দিয়েছে।  ওপেন  অনলাইন  পোলের  মাধ্যমে  ব্রিটিশ  প্রসপেক্ট  ম্যাগাজিন  পৃথিবীর  ১০০  জন  পাবলিক  চিন্তাবিদের  মধ্যে  তারিককে  অষ্টম  স্থানে  প্লেস  করেছে।  তিনি  সমসাময়িক  ইসলাম,  রাজনীতি  ও  আন্তর্জাতিক  সম্পর্ক  বিষয়ে  অসংখ্য  বই  লিখেছেন।  তারিক  পৃথিবীর  বিভিন্ন  দেশে  সামাজিক,  ধর্মীয়  ও  উচ্চশিা  প্রতিষ্ঠানে  হরহামেশা  সেমিনার,  সিম্পোজিয়াম  ও  প্যানেল  আলোচনায়  অংশ  নিয়ে  থাকেন।  ইউটিউবে  তার  অনেক  মূল্যবান  প্যানেল  ডিসকাশন  সাধারণ  শ্রোতা-দর্শকদের  জন্য  উন্মুক্ত  রয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ

https://alorpothe.wordpress.com/

মিশর একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে : ড. তারিক রামাদান

বর্তমান দিনগুলো মিশরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিশরীয়রা তাহরীর স্কোয়ারে জমায়েত হচ্ছে আর দাবী জানাচ্ছে সেনাবাহিনীর পতনের জন্য। তারা চাইছে একটি সত্য আর স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে বেসামরিক জনগণ তাদের আইনত অবস্থান আর ভূমিকা খুঁজে পাবে। আপাতত এতটুকু নিশ্চিত যে সামরিক সরকারের অভিপ্রায় এবং কর্মপদ্ধতি এরকম কিছু নয় একদমই। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পরপরই ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা হোসনি মুবারকের লেফটেনেন্ট, ৭৭ বছর বয়স্ক কামাল জানজুরির নাম প্রকাশ করে। একজন প্রার্থীর নাম প্রকাশের এই ছোট্ট ঘটনাটা বলে দেয় সামরিক সরকার কীভাবে অবস্থা সামলানোর চেষ্টা করছে। ফিল্ড মার্শাল তানতাওয়ি এবং তার লোকজন একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত নয় এবং আগ্রহীও নয়। তারা দৃশ্যপটের বাইরের কাউকে খুঁজছে যাকে মিত্র হিসেবে পাওয়া যাবে, চাইছে কিছু চুক্তি করতে যেন নিজেদের রক্ষা করা যায় এবং দেশের ক্ষমতাও সামলে রাখা যায়।

তাহরীর স্কোয়ারে বিক্ষোভরত মানুষগুলোর দরকার সাহায্য — কেননা তারা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যে মিশর একটি সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও প্রকৃত মুক্তি অর্জনই এজেন্ডা হয়ে থাকে — সেক্ষেত্রে এখন অনেক জিনিস নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুবারকের পতন ছিলো প্রথম ধাপ — কিন্তু এখন বিক্ষোভকারীরা মুবারক সরকারের কাঠামোর স্বরূপ টের পাচ্ছে, টের পাচ্ছে তাদের মিশন কেমন ছিলো, এমনকি তাদেরকে মুখোমুখিও হতে হচ্ছে মুবারকের মিত্রদের। বিক্ষোভকারীরা লড়ছে অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান এবং জটিল একটি বাহিনীকে যা মিশরীয়দের মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। তাই সামরিক সরকারকে শুধু অভ্যন্তরীন ইস্যু নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও সামলাতে হচ্ছে (ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, পশ্চিমা আর এশীয়দের স্বার্থ এবং অন্যান্য শক্তিশালী আন্দোলন প্রভৃতি)। কাজটা সহজ নয়। এদিকে বেশ ক’মাস সঙ্ঘাতবিহীন প্রতিবাদের পর (যখন সামরিক বাহিনীকে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হচ্ছিলো) এখন পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে দেখতে পাচ্ছি ধরপাকড়, আক্রমণ, হত্যা করতে। তারা হয়তবা ভুল স্বীকার করতে পারে কিন্তু রাজপথের ঘটনা তো বদলে গেছে। তাহরীরে প্রতিবাদরত মানুষগুলোর জন্য এখন আক্রমণাত্মক না হয়ে প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে গেছে। যদিও তাদের আন্দোলনের প্রথম দর্শন ছিলো — “অস্ত্র নয় বরং সাহস ও সম্মানের সাথে প্রতিবাদ”

গত শুক্রবারের ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের প্রচারনা ছিলো — “সর্বশেষ সুযোগ”। আমাদের আরো আশাবাদী হওয়া প্রয়োজন এবং চলমান সংকটের ব্যাপারে আরো গভীর বিশ্লেষণ করা দরকার। পর্দার অন্তরালে সামরিক সরকার একটা নোংরা খেলা খেলছে যেখানে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কেউ কেউ ধৈর্যধারণ হবার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে বলছেন — এটি একটি “ট্রানজিশন পিরিয়ড”। কথাটি আংশিক সঠিক — ট্রানজিশন কাটিয়ে উঠতে লাগে সময়, সমঝোতা আর প্রচেষ্টা। কিন্তু মিশরে এখন ঠিক এটিই ঘটছে না। গণতন্ত্রের ডাক শোনা যাচ্ছে, কিছু আশার বাণী শোনা যাচ্ছে (সামরিক সরকার বলছে তারা আগামী জুন মাসে ক্ষমতা ছেড়ে দিবে) এবং পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে — সেই প্রেক্ষিতে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ক আলোচনা চলছে। সামরিক সরকার অনেক বড় খেলোয়াড় — যারা মিশরের জনপ্রিয় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের সংস্পর্শে রয়েছে। এদের মধ্যে অবশ্যই মুসলিম ব্রাদারহুড রয়েছে। ইসলামিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চলছে বড় ধরণের টানাপোড়েন — তাদের কিছু নেতা নতুন প্রজন্মের ঘনিষ্টজন এবং তারা সহমত জানাচ্ছে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থার একটা আমূল পরিবর্তন আনতে। অন্যদিকে বর্তমান নেতৃত্বের অধিকাংশ নেতারা চাইছেন সামাজিকভাবে তাদের ভবিষ্যত ভূমিকা ঠিক রাখতে এবং সামরিক বাহিনীর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে চলমান অচলাবস্থা নিরসনের জন্য। তারা তাদেরকে এই আন্দোলন-প্রতিবাদ থেকে দূরে রাখছেন এবং সিভিল সোসাইটি এবং সামরিক সরকারের মাঝে দুর্বোধ্য একটি ভূমিকা পালন করছেন। অন্যদিকে এটা ভুলে গেলেও চলবে না যে আমেরিকা এই আলোচনার বাইরে নয়। সামরিক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র আমেরিকা যাদের মুখে আমরা শুনতে পাই তারা চাইছে বেসামরিক লোকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হোক — সুতরাং যুক্তরাস্ট্রের ভূমিকা হলো অপরিষ্কার ও ধোঁয়াটে। সামরিক সরকার এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যকার কোন সমঝোতা মার্কিন প্রশাসনের জন্য আকর্ষণীয় কোন ফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে। আরো হতে পারে যদি তারা কোন “বেসামরিক লোক” খুঁজে পান যিনি রাজপথ সামলাতে পারবেন এবং তাদের স্বার্থোদ্ধারে কাজে আসবেন — যেমন মোহাম্মদ আল বারাদি। যতই দিন যাচ্ছে, মিশরের বসন্তকে মনে হচ্ছে শীতল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ যেখানে সাধারণ জনগণের চাওয়া-পাওয়া হলো গৌণ।

মিশর তিউনিশিয়া নয়। প্রথম থেকেই আমি মিশরের আন্দোলনে তিউনিশিয়াকে অনুকরণ করার ব্যাপারে নেতিবাচক ছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে ভুল প্রমাণ করেছিলো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট আমার অভিমতকে ক্রমাগত সঠিক প্রমাণ করছে। ঘটনার চেহারা বদলে যেতে পারে। আগে থেকে আন্দোলন ছিলো — তাতে অনেক আশা জেগেছিলো যখন মুবারক বিদায় নেয়। কিন্তু আমরা তিউনিশিয়ার উদাহরণ থেকে যেহেতু অনেক দূরে — এটা লক্ষ্যণীয় যে মিশরের অবস্থা সেই আলোকেই বুঝতে হবে যেখানে সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া একটা জটিল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের কিছু গোপন বৈঠক চলছে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় কাউন্সিল, যুক্তরাস্ট্র এবং ইউরোপিয়ান সরকারসমূহের মধ্যে যা আমাদের একটা ধারণা দেয় যে কী ঘটছে আসলে। তিউনিশিয়া এমনকি মরক্কোর প্রেক্ষাপট অনেক ভিন্ন — সেখানে ইসলামিক দলগুলো রাজনীতির মাঠে ও পথ পরিক্রমায় নতুন ভুমিকা পালন করতে যাচ্ছে।

পারস্পরিক স্বার্থ-সাংঘর্ষিক শক্তিগুলো অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাচ্ছে। জনগণের চাওয়ার মূখ্য বিষয়গুলো হুমকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে যেমন রয়েছে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ, তেমন রয়েছে সাংঘর্ষিক স্বার্থ। মিশর, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আলোর মুখ থেকে অনেক দূরে। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এই অঞ্চলের অনেক ক্ষমতাধর মতপ্রদানকারীর কোন আগ্রহ নেই। এই সংগ্রাম সহজ হবেনা। যাই হোক না কেন, যেকোন অবস্থাতেই আমাদের উচিত হবে সাধারণ মানুষদের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং সমর্থন প্রদান করা যারা হাল ছেড়ে দিতে নারাজ।

তারা রয়েছেন মিশর, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের রাজপথে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন লিবিয়ায়। তাদের পক্ষ নেয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নিরীহ মানুষদের অযথা হত্যা করা হচ্ছে না বরং পর্দার অন্তরালের এই নোংরা হিসাব-নিকাশের তাৎক্ষণিক ফলাফল যাই হোক না কেন — প্রকৃতপক্ষে আরব বিশ্বে কিছু ঘটছে। আজ অথবা কালকের ঘটনাগুলোর মাঝে শুধু আশাই নয়, বরং একটা ঐতিহাসিক সত্য লুকিয়ে আছে — আরবরা তাদের স্বাধীনতা আর অধিকার ফিরে পাবে। সামরিক বাহিনী, পশ্চিমা এবং এশিয়ার ক্ষমতাধররা অথবা মিশরের সেই রাজনৈতিক পুতুলগুলো — যারা আপাতত তাদের কিছু স্বার্থসিদ্ধি করছে, তারা কখনই জনগণকে তাদের অধিকার ও সম্মান অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার, আর সাহসের। এখন তো সাহসিকতা দেখা যায় আরবের পথে-প্রান্তরের সবখানে।

—————————

লেখা সম্পর্কিত কিছু তথ্যঃ

ড. তারিক রামাদান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কনটেমপোরারি ইসলামিক স্টাডিজের প্রফেসর। তিনি জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ করেছেন দর্শন এবং ফরাসি সাহিত্যে; ডক্টরেট করেছেন অ্যারাবিক এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ এ ইউনিভার্সিটি অফ জেনেভা থেকে। ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসের টাইম ম্যাগাজিনের জরীপে বিশ্বের সেরা ১০০ জন বিজ্ঞানী এবং থিঙ্কারের তালিকায় তারিক রামাদান রয়েছেন।

লেখাটি গালফ নিউজে প্রকাশিত হয় ২৯ নভেম্বর, ২০১১।

অনুবাদ করেছেনঃ স্বপ্নচারী আব্দুল্লাহ, ব্লগার ও সচেতন পাঠক।

তথ্যসূত্রঃ

https://alorpothe.wordpress.com/

ইসলামিক স্টেট কেন ইসলামিক নয় : তারিক রামাদান

এবার ইসলামিক স্টেট (আইএস) নিয়ে মুখ খুললেন প্রখ্যাত মুসলিম ব্যক্তিত্ব তারিক রামাদান। ইরাক ও সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেট যা করছে তা ইসলামের মূলনীতি বিরোধীবলে তিনি উল্লেখ করেন।
শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও ইসলামিক রাষ্ট্র অর্থ্যাত্ খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে আইএস যা করছে তা ইসলামবিরোধী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত রোববার তিনি এসব মন্তব্য করেন। খবর আল জাজিরার
এক সময়ের ‘দি ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড দ্যা লেভান্ট’ (আইএসআইএল) এখন নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ইসলামিক স্টেট বা আইএস। এই আইএস এখন সারাবিশ্বের আলোচিত একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে আইএস ইসলামিক খিলাফত ঘোষণা করেছে; ঘোষণা করা হয়েছে খলিফার নামও। আর খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের গণহারে হত্যা করছে, সাংবাদিকদের শিরশ্ছেদ করছে।
স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল বাগদাদীর ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের কোন স্থান নেই। বরং তাদেরকে কচুকাটা করা হচ্ছে। ভীত বিহ্বল হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণবাজি রেখে পালাচ্ছে সংখ্যালঘু শিয়া, কুর্দি ও ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোকজন।
আবু বকর আল বাগদাদীর আহবানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো মুসলিম তরুণ-যুবক এই কথিত ইসলামী রাষ্ট্রে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে। কিন্তু তারিক রামাদান কথিত এই খলিফা ও তার অনুসারীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, শরীয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী রাষ্ট্রের নামে আপনারা নিরীহ মানুষদের হত্যা করছেন কেন?
এর আগেও বিশ্বের ১২০ জনেরও বেশি মুসলিম স্কলার আইএস-এর তীব্র সমালোচনা করে বিবৃতি দেন। এই খলিফা এবং তার ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে যে ইসলামের প্রাথমিক যুগের খলিফাদের পার্থক্য কী তা বুঝতে পারছেন সারা বিশ্বের মুসলিমরা।
তারিক রামাদান বলেন, ‘তারা (আইএস) ইসলামের পুরো বার্তাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই আমরা বলতে চাই… কী করছো তোমরা, নিরীহ-নিরপরাধ মানুষদেরকে হত্যা করছো শরীয়াহ আইন ও ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের নামে। এসব কিছু ইসলামের মূলনীতির বিরোধী।’
তারিক রামাদান স্পষ্টভাবেই বলেন, ‘এটা খিলাফত নয়। এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক খেলা; ব্যতিক্রমটা হচ্ছে- এর সঙ্গে ধর্মীয় সংযোগ সাধন করা হয়েছে এবং এ কারণেই মুসলিম স্কলার ও বুদ্ধিজীবিগণ এই খিলাফতকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তারিক রামাদান বলেন, আমরা এই সত্যটা বলতে চাই- আইএস ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করছে না। বর্তমানে অনেক মুসলিম নামধারী স্বৈরশাসকও রয়েছে, যারা ইসলামের মূলনীতির অনুসরণ করছে না।’
তিনি বলেন, ‘তারা (আইএস) ইসলামের মূলনীতির অনুসরণ করছে না কারণ আমাদের মূলনীতি তো পরিষ্কার: ইসলামিক রাষ্ট্রের নেতৃত্বদানকারী হবেন জনগণের দ্বারাই নির্বাচিত বা যারা তার অনুসরণ করেন, তিনি তাদের নেতা হবেন। বর্তমানে পশ্চিমাদের অনুসরণকারী অনেক দেশ আইএস-এর মতো এতোটা মন্দ নয়।’
তারিক রামাদান আরও বলেন, ‘মুসলমানদের প্রধান সমস্যাগুলো মুসলমানদের মধ্যে থেকেই আবির্ভূত হয়, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে।’
যেসব মুসলিম স্কলার আইএস-কে সমর্থন করেন তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের সমালোচনা করে কথা বলি, তখনও দেখা যাবে এক ধরনের মুসলিম বিশেষজ্ঞ আবির্ভূত হন, যারা তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন এবং আমাদের বিরোধিতা করেন।’
কেন মুসলিম স্কলারগণ মুসলিম বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না এবং কেন মুসলিম বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ আজ বৈশ্বিক শক্তি ও আঞ্চলিক স্বৈরশাসকদের হাতে কুক্ষিগত তা-ও ব্যাখ্যা করেন তারিক রামাদান। তবে, এর বিস্তারিত আল জাজিরার অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত হয়নি। তিনি আল জাজিরা টেলিভিশনে এর কারণটি ব্যাখ্যা করেন। গত রোববার আল জাজিরা টেলিভিশনে এটি প্রচারিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ

http://www.amardeshonline.com/pages/details/2014/10/15/259140#.VNWADyxkDcs

বইঃ বালা-মুসিবত: কারণ ও করণীয়

bala

সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ সংশয়বাদীরা প্রশ্ন করে: যদি স্রষ্টা থেকেই থাকেন, তবে পৃথিবীতে বিপদাপদ, রোগ-শোক, যুলুম-অনাচার এবং সর্বোপরি মন্দের অস্তিত্ব কিভাবে সম্ভব? এই আলোচনায় সংশয়বাদীদের এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার পাশাপাশি আলোকপাত করা হয়েছে বালা-মুসিবতের বিভিন্ন কারণ, তাৎপর্য ও করণীয় সম্পর্কে৷

লেখকঃ  মুহাম্মাদ নাসীল শাহরুখ

পৃষ্ঠাঃ ৩৪

ডাউনলোড করুন 

http://server1.quraneralo.com/book/Bala-Musibat_3rd_Ed_QA.pdf

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দানশীলতা ও কৃপণতা

180

মহান আল্লাহ বলেন,

“তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার বিনিময় দেবেন।”(সূরা সাবা ৩৯)

তিনি আরো বলেন,

 “তোমরা যা কিছু ধন-সম্পদ দান কর, তা নিজেদের উপকারের জন্যই। আল্লাহর সন্তোষটি ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে তোমরা দান করো না। আর তোমরা যা দান কর, তার পুরস্কার পূর্ণভাবে প্রদান করা হবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।” (সূরা বাক্বারাহ ২৭২)

তিনি অন্যএ বলেন,

 “তোমরা যা কিছু ধন-সম্পদ দান কর, আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।”(সূরা বাক্বারাহ ২৭৩)

 এ বিষয়ে অনেক হাদীস উল্লেখ করা হল।

১) ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন, “কেবলমাত্র দুটি বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় (১) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন,অতঃপর তাকে হক পথে অকাতরে দান করার ক্ষমতা দান করেছেন এবং (২) ঐ ব্যক্তির প্রতি যাকে মহান আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, অতঃপর সে তার দ্বারা ফায়সালা করে ও তা শিক্ষা দেয়”।(সহীহুল বুখারী ৭৩, ১৪০৯, ৭১৪১, মুসলিম ৮১৬)

*হাদীসের অর্থ হল, উক্ত দুই প্রকার মানুষ ছাড়া অন্য কারো প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ নয়।

২) উক্ত রাবী থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকদেরকে প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি কে আছে, যে নিজের সম্পদের চেয়ে তার  ওয়ারেসের সম্পদকে বেশি প্রিয় মনে করে?” তাঁরা জবাব দিলেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! আমাদের মাঝে এমন কোন ব্যক্তি কেউ নেই, যে তার নিজের সম্পদকে বেশি প্রিয় মনে করে না।’ তখন তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই মানুষের নিজের সম্পদ তাই, যা সে আগে পাঠিয়েছে। আর এ ছাড়া যে মাল বাকী থাকবে, তা হল ওয়ারেসের মাল”। (সহীহুল বুখারী ৬৪৪২, নাসায়ী ৩৬১২,আহমাদ ৩৬১৯)

৩) আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, “তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো; যদিও খেজুরের এক টুকরো সাদকাহ করে হয়।”(সহীহুল বুখারী ১৪১৩,১৪১৭,৩৫৯৫,৬০২৩, নাসায়ী ২৫৫২,২৫৫৩,আহমাদ ১৭৭৮২)

৪) জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ)-এর নিকট এমন কোন জিনিসই চাওয়া হয়নি, যা জবাব দিয়ে তিনি ‘না’ বলেছেন।(সহীহুল বুখারী ৬০৩৪,আহমাদ ১৩৭৭২)

৫) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, “প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের বিনিময় দিন।’ আর অপরজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস দিন।”(সহীহুল বুখারী ১৪৪২, মুসলিম ১০১০)

৬) উক্ত রাবী কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি (অভাবীকে) দান কর, আল্লাহ তোমাকে দান করবেন।’(সহীহুল বুখারী ৪৬৮৪, ৫৩৫২, ৭৪১১, তিরমিযী ৩০৪৫)

৭) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ’স (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইসলামের কোন কাজটি উওম?’ তিনি জবাব দিলেন, “তুমি অন্নদান করবে এবং পরিচিত ও অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে।”(সহীহুল বুখারী ১২, ২৮, ৬২৩৬, তিরমিযী ১৮৫৫, নাসায়ী ৫০০০)

৮) উক্ত রাবী কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “চল্লিশটি সৎকর্ম আছে, তার মধ্যে উচ্চতম হল, দুধ পানের জন্য (কোন দরিদ্রকে) ছাগল সাময়িকভাবে দান করা। যে কোন আমলকারী এর মধ্যে হতে যে কোন একটি সৎকর্মের উপর প্রতিদানের আশা করে ও তার প্রতিশ্রত পুরস্কারকে সত্য জেনে আমল করবে, তাকে আল্লাহ তার বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।”(সহীহুল বুখারী ২৬৩১, আহমাদ ৬৪৫২,৬৭৯২,৬৮১৪)

৯) আবূ উমামাহ সুদাই বিন আজলান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “হে আদম সন্তান! প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল (আল্লাহর পথে) খরচ করা তোমার জন্য মঙ্গল এবং তা আটকে রাখা তোমার জন্য অমঙ্গল। আর প্রয়োজন মত মালে তুমি নিন্দিত হবে না। প্রথমে তাদেরকে দাও, যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে। আর উপরের (উপুর) হাত নিচের (চিৎ) হাত অপেক্ষায় উওম।”(মুসলিম ১০৩৬, তিরযিমী ২৩৪৩)

১০) আনাস (রাঃ) বলেন, ইসলামের স্বার্থে (অর্থাৎ নও মুসলিমের পক্ষ থেকে) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট যা চাওয়া হত, তিনি তা-ই দিতেন। (একবার) তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এল। তিনি তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যস্থলের সমস্ত বকরীগুলো দিয়ে দিলেন। তারপর সে তার সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহন কর। কেননা, মুহাম্মাদ (সাঃ) ঐ ব্যক্তির মত দান করেন, যার দারিদ্রতার ভয় নেই।’ যদিও কোন ব্যক্তি কেবলমাত্র দুনিয়া অর্জন করার জন্য ইসলাম গ্রহণ করত। কিন্ত কিছুদিন পরেই ইসলাম তার নিকট দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু থেকে প্রিয় হয়ে যেত।(মুসলিম ২৩১২, আহমাদ ১১৬৩৯, ১২৩৭৯)

১১) উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কিছু মাল বণ্টন করলেন। তারপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! অন্য লোকেরা এদের চেয়ে এ মালের বেশি হকদার ছিল।’ তিনি বললেন, “এরা আমাকে দু’টি কথার মধ্যে একটা না একটা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। হয় তারা আমার নিকট অভদ্রতার সাথে চাইবে (আর আমাকে তা সহ্য করে তাদেরকে দিতে হবে) অথবা তারা আমাকে কৃপণ আখ্যায়িত করবে। অথচ, আমি কৃপণ নই।” (মুসলিম ১০৫৬, আহমাদ ১২৮, ২৩৬)

১২) জুবাইর ইবনে মুত্বইম (রাঃ) বলেন, তিনি হুনাইনের যুদ্ধ থেকে ফিরার সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে আসছিলেন। (পথিমধ্যে) কতিপয় বেদুঈন তাঁর নিকট অনুনয়-বিনয় করে চাইতে আরম্ভ করল, এমন কি শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে বাধ্য করে একটি বাবলা গাছের কাছে নিয়ে গেল। যার ফলে তাঁর চাদর (গাছের কাঁটায়) আটকে গেল। নবী (সাঃ) থেমে গেলেন এবং বললেন, “তোমরা আমাকে আমার চাদরখানি দাও। যদি আমার নিকট এসব (অসংখ্য) কাঁটা গাছের সমান উঁট থাকত, তাহলে আমি তা তোমাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতাম। তারপর তোমরা আমাকে কৃপণ, মিথ্যুক বা কাপুরুষ পেতে না।”(সহীহুল বুখারী ২৮২১, ৩১৪৮)

১৩) আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “সাদকাহ করলে মাল কমে যায় না এবং ক্ষমা করার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা (ক্ষমাকারীর) সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর কেও আল্লাহর (সন্তোষটির) জন্য বিনয়ী হলে, আল্লাহ আযযা অজাল্ল তাঁকে উচ্চ করেন।”(মুসলিম   ২৫৮৮, তিরমিযী ২০২৯)

১৪) আবূ কাবশাহ আমর ইবনে সা’দ আনসারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, “আমি তিনটি জিনিসের ব্যাপারে শপথ করছি এবং তোমাদেরকে একটি হাদীস বলছি তা স্মরন রাখোঃ (এক) কোন বান্দার মাল সাদকাহ করলে কমে যায় না। (দুই) কোন বান্দার উপর কোন প্রকার অত্যাচার করা হলে এবং সে তার উপর ধৈর্য-ধারন করলে আল্লাহ নিশ্চয় তাঁর সম্মান বাড়িয়ে দেন, আর (তিন) কোন বান্দা যাচ্ঞার দুয়ার উদঘাটন করলে আল্লাহ তার জন্য দারিদ্রতার দরজা উদঘাটন করে দেন।” অথবা এই রকম অন্য শব্দ তিনি ব্যবহার করলেন।

“আর তোমাদেরকে একটি হাদীস বলছি তা স্মরন রাখো”। তিনি বললেন, “দুনিয়ায় চার প্রকার লোক আছে; (১) ঐ বান্দা, যাকে আল্লাহ ধন ও (ইসলামী) জ্ঞান দান করেছেন। অতঃপর সে তাতে আল্লাহকে ভয় করে এবং তার মাধ্যমে নিজ আত্মীয়তা বজায় রাখে। আর তাতে যে আল্লাহর হক রয়েছে তা সে জানে। অতএব সে (আল্লাহর কাছে) সবচেয়ে উৎকৃষ্ট স্তরে অবস্থান করবে। (২) ঐ বান্দা, যাকে আল্লাহ (ইসলামী) জ্ঞান দান করেছেন; কিন্তু মাল দান করেননি। সে নিয়তে সত্যনিষ্ট, সে বলে যদি আমার মাল থাকত, তাহলে আমি (পূর্বাক্ত) অমুকের মত কাজ করতাম। সুতরাং সে নিয়ত অনুসারে বিনিময়ে পাবে; এদের উভয়ের প্রতিদান সমান। (৩) ঐ বান্দা, যাকে আল্লাহ মাল দান করেছেন; কিন্তু (ইসলামী) জ্ঞান দান করেননি। সুতরাং সে না জেনে অবৈধরূপে নির্বিচারে মাল খরচ করে; সে তাতে আল্লাহকে ভয় করে না, তার মাধ্যমে নিজ আত্মীয়তা বজায় রাখে না এবং তাতে যে আল্লাহর হক রয়েছে তাও সে জানে না। অতএব সে (আল্লাহর কাছে) সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান করবে। আর (৪) ঐ বান্দা, যাকে আল্লাহ ধন ও (ইসলামী) জ্ঞান কিছুই দান করেননি। কিন্তু সে বলে, যদি আমার নিকট মাল থাকত, তাহলে আমিও আমি (পূর্বাক্ত) অমুকের মত কাজ করতাম। সুতরাং সে নিয়ত অনুসারে বিনিময়ে পাবে; এদের উভয়ের পাপ সমান।” (তিরমিযী ২৩২৫, ইবনে মাজাহ ৪২২৮)

১৫) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদিন তাঁরা একটি ছাগল জবাই করলেন। তারপর নবী (সাঃ) বললেন, “ছাগলটির কতটা (মাংস) অবশিষ্ট আছে? আয়েশা (রাঃ) বললেন, ‘কেবলমাত্র কাঁধের মাংস ছাড়া তার কিছুই বাকী নেই।’ তিনি বললেন, “(বরং) কাঁধের মাংস ছাড়া সবটাই বাকী আছে।”(তিরমিযী ২৪৭০, আহমাদ ২৩)

*অর্থাৎ, আয়েশা (রাঃ) বললেন, ‘তার সবটুকু মাংসই সাদকা করে দেওয়া হয়েছে এবং কেবলমাত্র কাঁধের মাংস বাকী রয়ে গেছে।’ উওরে তিনি বললেন, “কাঁধের মাংস ছাড়া সবই আখেরাতে আমাদের জন্য বাকী আছে।” (আসলে যা দান করা হয়, তাই বাকী থাকে।)

১৬) আসমা বিন্তে আবূ বাকর (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) আমাকে বললেন, “তুমি সম্পদ বেঁধে (জমা করে) রেখো না, এরূপ করলে তোমার নিকট (আসা থেকে) তা বেঁধে রাখা হবে।” অন্য এক বর্ণনায় আছে, “খরচ কর, গুনে গুনে রেখো না, এরূপ করলে আল্লাহও তোমাকে গুনে গুনে দেবেন।আর তুমি জমা করে রেখো না, এরূপ করলে আল্লাহও তোমার প্রতি (খরচ না করে) জমা করে রাখবেন।(সহীহুল বুখারী ১৪৩৩,১৪৩৪,২৫৯০,২৫৯১ মুসলিম ১০২৯)

১৭) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, “কৃপণ ও দানশীলের দৃষ্টান্ত এমন দুই ব্যক্তির মত, যাদের পরিধানে দু’টি লোহার বর্ম রয়েছে। যা তাদের বুক থেকে টুঁটি পর্যন্ত বিস্তৃত। সুতরাং দানশীল যখন দান করে, তখনই সেই বর্ম তার সারা দেহে বিস্তৃত হয়ে যায়, এমনকি (তার ফলে) তা তার আঙ্গুলগুলোকেও ঢেকে ফেলে এবং তার পদচিহ্ন (পাপ বা ত্রুটি) মুছে দেয়। পক্ষান্তরে কৃপণ যখনই কিছু দান করার ইচ্ছা করে, তখনই বর্মের প্রতিটা আংটা যথাস্থানে এঁটে যায়। সে তা প্রশস্ত করতে চাইলেও তা প্রশস্ত হয় না।”(সহীহুল বুখারী ১৪৪৪,২৯১৭,৫৭৯৭ মুসলিম ১০২১)

১৮) উক্ত রাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি (তার) বৈধ অর্থ ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণই করেন না— সে ব্যক্তির ঐ দানকে আল্লাহ ডান হাতে গ্রহন করেন। তারপর তা ঐ ব্যক্তির জন্য লালন-পালন করেন, যেমন তোমাদের কেউ তার অশ্ব-শাবককে লালন-পালন করে থাকে। পরিশেষে তা পাহাড়ের মত হয়ে যায়।”(সহীহুল বুখারী ১৪১০, মুসলিম ১০১৪)

১৯) উক্ত রাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “এক ব্যক্তি বৃক্ষহীন প্রান্তরে মেঘ থেকে শব্দ শুনতে পেল, ‘অমুকের বাগানে বৃষ্টি বর্ষন কর।’ তারপর সেই মেঘ সরে গিয়ে কালো পাথুরে এক ভূমিতে বর্ষন করল। তারপর (সেখানকার) নালাসমূহের মধ্যে একটি নালা সম্পূর্ণ পানি নিজের মধ্যে জমা করে নিল। লোকটির সেই পানির অনুসরণ করে কিছু দূর গিয়ে দেখল, একটি লোক কোদাল দ্বারা নিজ বাগানের দিকে পানি ঘুরাচ্ছে। সে তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কি ভাই?’ বলল, ‘অমুক’। এটি ছিল সেই নাম, যে নাম মেঘের আড়ালে সে শুনেছিল। বাগান-ওয়ালা বলল, ‘ওহে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম কেন জিজ্ঞাসা করলে?’ লোকটি বলল, আমি মেঘের আড়াল থেকে তোমার নাম ধরে তোমার বাগানে বৃষ্টি বর্ষন করতে আদেশ শুনলাম।

তুমি কি এমন কাজ কর? বাগান-ভাগলা বলল, ‘এ যখন বললে, তখন বলতে হয়; আমি এই বাগানের উৎপন্ন ফল-ফসলকে ভেবে-চিন্তে তিন ভাগে ভাগ করি। তারপর তার এক ভাগ দান করি, এক ভাগ আমি আমার পরিজনসহ খেয়ে থাকি এবং বাকী এক ভাগ বাগানের চাষ-খাতে ব্যয় করি।”(মুসলিম ২৯৮৪, আহমাদ ৭৮৮১)

কৃপণতা ও ব্যয়কুণ্ঠতা 

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। আর সদ্বিষয়কে মিথ্যাজ্ঞান করে অচিরেই তার জন্য আমি সুগম করে দেব (জাহান্নামের) কঠোর পরিণামের পথ। যখন সে ধ্বংস হবে, তখন তার সম্পদ তার কোন কাজেই আসবে না।” (সূরা লাইল ৮-১১)

তিনি আরো বলেন,

وَمَن يوقَ شُحَّ نَفسِهِ فَأُولٰئِكَ هُمُ المُفلِحونَ

অর্থাৎ, যারা অন্তরে কার্পণ্য হতে মুক্ত, তারাই সফলকাম।(সূরা তাগাবূন ১৬)

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “অত্যাচার করা থেকে বাঁচ। কেননা, অত্যাচার কিয়ামতের দিনের অন্ধকার। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো । কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে।(এই কৃপণতাই) তাদেরকে প্ররোচিত করেছিল, ফলে তারা নিজদের রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের উপর হারামকৃত বস্তুস্মূহকে হালাল করে নিয়েছিল।”(মুসলিম ২৫৭৮, আহমাদ ১৪০৫২)

প্রতিবেশীর অধিকার ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার গুরুত্ব

আমরা আজ যে সমাজ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত তাতে আমাদের অনুভূতিগুলোও দিন দিন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে অবিশ্বাস আর সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখাই যেন আজকালকার যুগের সবার চিন্তাধারার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইট পাথরের দালানে থাকা আমরাও যেন অনুভূতিহীন কলের পুতুল। পাশের দরজার প্রতিবেশীর বিপদে আপদে, তাদের সুখ দুঃখের সঙ্গী হওয়া তো আজকাল দুরের কথা, কেউ কাউকে চিনিই না অনেক সময়। এরপরও কি আমরা দাবী করতে পারি আমরা সত্যিকারের মুসলমান? আসুন দেখি প্রতিবেশীদের অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর রাসুল আমাদেরকে কি বলেছেন।

wwee

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا

অর্থাৎ, তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না, এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। ( সূরা নিসা: ৩৬)

এই সম্পর্কিত হাদিস সমূহ-

১) ইবনে উমার ও আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “জিব্রাইল আমাকে সব সময় প্রতিবেশী সম্পর্কে অসিয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার মনে হল যে, তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারেস বানিয়ে দেবেন।” (সহীহুল বুখারী ৬০১৪ ও মুসলিম ২৬২৪)

২) আবূ যার (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “হে আবূ যার! যখন তুমি ঝোল (ওয়ালা তরকারি) রান্না করবে, তখন তাতে পানির পরিমান বেশী কর। অতঃপর তোমার প্রতিবেশীর বাড়িতে রীতিমত পৌছে দাও। (মুসলিম ২৬২৫)

৩) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, “আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়।” জিজ্ঞেস করা হল, ‘কোন ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, “যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।” (সহীহুল বুখারী ৬০১৬)

৪) মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে  থাকে না। উক্ত সাহাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন প্রতিবেশিনী যেন তার অপর প্রতিবেশিনীর উপঢৌকনকে তুচ্ছ মনে না করে; যদিও তা ছাগলের পায়ের ক্ষুর হক না কেন। (সহীহুল বুখারী ২৫৬৬ ও মুসলিম ১০৩০)

৫) উক্ত সাহাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কোন প্রতিবেশী যেন তার প্রতিবেশীকে তার দেওয়ালে কাঠ (বাঁশ ইত্যাদি) গাড়তে নিষেধ না করে। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন, কী ব্যাপার আমি তোমাদেরকে রসূল (সাঃ)-এর সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরাতে দেখছি! আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আমি এ (সুন্নাহ)কে তোমাদের ঘাড়ে নিক্ষেপ করব (অর্থাৎ এ কথা বলতে থাকব)। (সহীহুল বুখারী ২৪৬৩,৫৬২৭ ও মুসলিম ১৬০৯)

৬) উক্ত রাবী (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহেমানের খাতির করে। এবং যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, নচেৎ চুপ থাকে।” (সহীহুল বুখারী ৬০১৮,৩৩৩১, মুসলিম ৪৭, ১৪৬৮)

৭) আবূ শুরায়হ খু্যায়ী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার কর। যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহেমানের খাতির করে। এবং যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা নীরব থাকে।” (সহীহুল বুখারী ৬০১৯,৬১৩৫, মুসলিম ৪৮)

৮) আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, “হে আল্লাহর রসূল! আমার দু’জন প্রতিবেশী আছে।(যদি দু’জনকেই দেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে) আমি তাঁদের মধ্যে কার নিকট হাদিয়া (উপঢৌকন) পাঠাব?’ তিনি বললেন, “যার দরজা তোমার বেশী নিকটবর্তী, তার কাছে (পাঠাও)।” (সহীহুল বুখারী ৬০২০,২২৫৯, আবূ দাউদ ৫১৫৫)

৯) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আল্লাহর নিকট সর্ব উওম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উওম। আল্লাহর নিকট সেই প্রতিবেশী সর্ব উওম, যে তার প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে সর্বাধিক উওম।” (তিরমিযী ১৯৪৪, আহমাদ ৬৫৩০, দারেমী ২৪৩৭)